সূরা আত-তাওবাহ্: কুরআনের একটি অন্ধকার বাস্তবতা

সূরা আত-তাওবাহ্ ইসলামের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অধ্যায়, যা সপ্তম শতাব্দীর আরবে একটি উদীয়মান রাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটায়। ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এই সূরাটি কোনো প্রচলিত ধর্মীয় উপদেশের চেয়ে বরং একটি 'মিলিটারি ডকট্রিন' বা সামরিক নীতিমালার মতো কাজ করেছে। এই সূরার কঠোর সুর এবং এর অন্তর্গত বিধানগুলো আধুনিক মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে প্রায়ই অমানবিক এবং সহিংসতা উস্কানিদাতা হিসেবে সমালোচিত হয়। বিশেষ করে সূরার ৫ম আয়াত, যা ইতিহাসে ‘আয়াতুস সাইফ’ বা তলোয়ারের আয়াত নামে পরিচিত, সেখানে মুশরিকদের যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ বা ‘জাতিগত নিধন’ এর সমতুল্য।

এই সূরার আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো ২৯ নম্বর আয়াত, যেখানে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের (আহলে কিতাব) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং তাদের ‘জিজিয়া’ নামক কর দিতে বাধ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোতে এটি নাগরিক সাম্যের পরিপন্থী এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ বা জিম্মি হিসেবে চিহ্নিত করার নামান্তর। মানবাধিকারের বৈশ্বিক ঘোষণাপত্রের (UDHR) সাথে এর তুলনা করলে দেখা যায়, এটি নাগরিক মর্যাদার সমঅধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।

সূরা আত-তাওবাহ্-র অভ্যন্তরীণ কঠোরতা কেবল বহিরাগত শত্রুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ‘মুনাফিক’ বা ছদ্মবেশী রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতিও ছিল চরম নির্মম। এই সূরায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাদের জানাজা না পড়া হয় এবং তাদের নির্মিত স্থাপনা (যেমন: মসজিদে দ্বিরার) গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আধুনিক মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার মানদণ্ডে এটি রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সূরা আত-তাওবাহ্-এর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা একাধারে ধর্মতাত্ত্বিক কঠোরতা, তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানবতাবাদী দর্শনের এক বিশাল সংঘাত দেখতে পাই।

তলোয়ারের আয়াত (আয়াত ৫) ও ‘গণহত্যা’র অভিযোগ: এই আয়াতে বলা হয়েছে, "হারাম মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো..."। আমার মতে, এটি কোনো দয়ালু স্রষ্টার বাণী হতে পারে না, বরং এটি একটি ‘জেনোসাইডাল’ বা গণহত্যামূলক নির্দেশ। যুক্তি হলো, কোনো মানুষের অপরাধের জন্য তাকে ধর্ম পরিবর্তনের সুযোগ দিয়ে বা দেশান্তরী করে হত্যা করা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। বিপরীতে, তাফসীরে জালালাইন ও ইবনে কাসীর-এ বলা হয়েছে, এই নির্দেশটি কেবল তাদের জন্য ছিল যারা 'হুদাইবিয়ার সন্ধি' ভঙ্গ করে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। আমার যুক্তি হল, যদি এটি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য হতো, তবে এর ভাষা কেন এতো সার্বজনীন করা হলো? কুরআনে যদি তৎকালীন পরিস্থিতির জন্য এই ধরণের আক্রমণাত্মক সূরা নাজিল হয় তবে কুরআন সার্বজনীন নয়। হাদিসে এসেছে, মুহাম্মদ বলেছেন: "আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৫)। আমরা নাস্তিকরা এই হাদিসটিকে ইসলামের প্রসারে বলপ্রয়োগের সবচেয়ে বড় দলিল হিসেবে গণ্য করি, যা আধুনিক ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’র ধারণাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

জিজিয়া কর (আয়াত ২৯) ও নাগরিক বৈষম্য: সূরার ২৯ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা ‘অপমানিত ও বশীভূত হয়ে জিজিয়া কর দেয়। আধুনিক সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি একটি ‘রেসিস্ট’ বা বর্ণবাদী ব্যবস্থা, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের নাগরিক মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। তাফসীরে তাবারী-তে 'সগিরুন' শব্দের অর্থ করা হয়েছে 'লাঞ্ছিত' বা 'হীন' অবস্থায় কর দেওয়া। আধুনিক মানবাধিকারের আলোকে এটি 'অ্যাপার্থাইড' বা বর্ণবৈষম্যের সমতুল্য। তবে ইসলামি স্কলাররা যুক্তি দেন যে, এটি ছিল একটি ‘প্রটেকশন ট্যাক্স’। ঐতিহাসিক সত্য হলো, তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যেও ভিন্নধর্মীদের ওপর কঠোর কর আরোপিত ছিল। কিন্তু একটি 'ঐশ্বরিক কিতাব' কেন তৎকালীন বর্বর যুগের কর ব্যবস্থার অনুকরণ করবে, যেখানে সবার সমান অধিকার থাকার কথা ছিল না?

মানবিক সম্পর্কচ্ছেদ ও ঘৃণা (আয়াত ২৩ ও ১১৩): এই সূরায় মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নিজেদের পিতা বা ভাইকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে। এমনকি মৃত আত্মীয়দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেও নিষেধ করা হয়েছে (আয়াত ১১৩)। এটিকে ‘পরিবার ধ্বংসকারী’ এবং ‘ঘৃণা উৎপাদনকারী’ মতবাদ হিসেবে দেখা হয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক আবেগ ও পারিবারিক বন্ধনকে ধর্মের দোহাই দিয়ে ছিন্ন করে দেয়। অন্যদিকে, ইসলামি ব্যাখ্যায় একে ‘আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য’ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, স্রষ্টার নির্দেশের ঊর্ধ্বে কোনো রক্ত সম্পর্ক থাকতে পারে না। কিন্তু এটি একটি ‘কাল্ট’ বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যের মতো, যা সদস্যদের বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

ভিন্নমত দমন: সূরার একটি বড় অংশ জুড়ে ‘মুনাফিকদের’ কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এমনকি যারা যুদ্ধে যেতে অলসতা করেছিল, তাদের চিরস্থায়ী জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছে। এটি একটি ‘একনায়কতান্ত্রিক’ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে কোনো প্রকার ভিন্নমত বা নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। সহীহ মুসলিম-এর হাদিস অনুযায়ী, যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, তাদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছিল (যেমন কাব বিন মালিকের ঘটনা)। এটিকে ‘সোশ্যাল বয়কট’ বা মানসিকভাবে পঙ্গু করার একটি অস্ত্র হিসেবে দেখা যায়, যা আধুনিক মুক্তচিন্তার বা বাকস্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিরোধী।

পরিশেষে বলা যায়, ঐতিহাসিকভাবে সূরা আত-তাওবাহ্ একটি উদীয়মান সাম্রাজ্যের ‘ডমিনেটিং পাওয়ার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের দলিল। আধুনিক মানবতাবাদী দর্শনে এই সূরাটি অসহিষ্ণুতা, যুদ্ধবাজ মানসিকতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি বড় উদাহরণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন এই আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করা হয়, তখন তা বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এর ভাষাগুলো চিরন্তন যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে কাজ করতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?