আল্লাহর বৈশিষ্ট কেন মানুষের মত ?

যখন আমি প্রথম কোরআনে আল্লাহর বর্ণনাগুলোর সাথে পরিচিত হই, বিশেষ করে যেগুলো তাঁর আরশে (সিংহাসনে) অবস্থানের ওপর জোর দেয়, তখন আমি এই বর্ণনার প্রাণবন্ত চিত্রকল্প এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্বে এর গুরুত্ব দেখে অভিভূত হই। যে আয়াতগুলো নিচে উল্লেখ করা হয়েছে, তা এক স্রষ্টা ও সর্বময় শাসকের ছবি আঁকে, যিনি মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের আসনে বসে আছেন। তবে, আমি যতই গভীরে গিয়েছি, ততই এই বর্ণনাগুলোর তাৎপর্য ও যে বিশ্বাসব্যবস্থা এগুলোকে ধারণ করে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়েছি, বিশেষত সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে। এখন আমি আমার বোঝাপড়াগুলো শেয়ার করতে চাই, আপনার দেওয়া আয়াতগুলোর আলোকে, এবং এগুলোর বিস্তৃত তাৎপর্য নিয়ে কিছু ভাবনা প্রকাশ করতে চাই।

কোরআন আল্লাহকে আরশে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে বর্ণনা করে, এবং এই ধারণাটি একাধিক আয়াতে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আর-রাদে বলা হয়েছে যে, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর আল্লাহ আরশে আসীন হয়েছেন (কোরআন ১৩:২)। একইভাবে, সূরা আল-হাদীদে উল্লেখ করা হয়েছে যে আল্লাহ ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর আরশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন (কোরআন ৫৭:৪)। সিংহাসনের এই চিত্রকল্প একজন শাসকের ইঙ্গিত দেয়, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যের ওপর নজর রাখছেন। এটি মানবীয় রাজত্ব ও ক্ষমতার ধারণার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আমি যখন এ নিয়ে চিন্তা করি, তখন আশ্চর্য লাগে যে এক কথিত অসীম সত্ত্বাকে এমন মানবসদৃশ রূপে উপস্থাপন করা হলো, যেন আল্লাহ তাঁর কর্তৃত্ব প্রদর্শনের জন্য শারীরিক আসনের প্রয়োজন অনুভব করেন। এখানেই প্রশ্ন জাগে, এই বর্ণনাগুলো কি আক্ষরিকভাবে নেওয়ার জন্য, নাকি কেবল প্রতীকী? আর কেন মুহাম্মদ (যাকে এই ওয়াহীপ্রাপ্তির বাহক বলা হয়) এমন মানবকেন্দ্রিক উপমা ব্যবহার করলেন এক সর্বশক্তিমান সত্ত্বাকে বর্ণনা করতে?

আরশ আবারও অন্যান্য আয়াতে ফিরে আসে, বিশেষ করে কিয়ামতের দিনের প্রেক্ষাপটে। সূরা আল-হাক্কায় কোরআন এক নাটকীয় দৃশ্য তুলে ধরে যেখানে আকাশ চিরে যাবে, ফেরেশতারা প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর আটজন ফেরেশতা আল্লাহর আরশ বহন করবে (কোরআন ৬৯:১৫-১৭)। মহাজাগতিক বিপর্যয় আর ঐশ্বরিক মহিমার এই বর্ণনা ভীতি ও বিস্ময় জাগানোর উদ্দেশ্যে সাজানো মনে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আরশ আসলে কী, সে ব্যাপারে কোরআন স্পষ্ট কিছু জানায় না। এটি কি একটি বাস্তব বস্তু, নাকি কেবল ক্ষমতার প্রতীক, নাকি সম্পূর্ণ অন্য কিছু? এই অস্পষ্টতা ব্যাখ্যার সুযোগ দেয়, কিন্তু একইসাথে ইঙ্গিত করে যে কবিত্বপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে বিশ্বাসীদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে আনুগত্য আদায় করা হচ্ছে।

সূরা আজ-জুমারে ফেরেশতাদের আরশ ঘিরে আল্লাহকে তাসবিহ করতে এবং তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করতে দেখা যায় (কোরআন ৩৯:৭৫)। সূরা গাফিরে বলা হয়েছে, যারা আরশ বহন করে এবং যারা এর চারপাশে আছে তারা আল্লাহর প্রশংসা করে, তাঁর ওপর ঈমান আনে এবং মুমিনদের ক্ষমার জন্য দোয়া করে (কোরআন ৪০:৭)। এসব আয়াত আল্লাহর দয়া ও জ্ঞানের কথা বলে, যা সবকিছুকে আচ্ছাদন করে। তবে এখানে কর্তৃত্ববাদী সুর স্পষ্ট, ফেরেশতাদের ক্রমাগত প্রশংসা ও বিচারদণ্ডের ওপর জোর দেওয়া আসলে বিশ্বাসীদের নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করানোর কৌশল বলেই মনে হয়। ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা চাইছে, এটাও এমন এক ধারণা, যা মানুষকে বারবার তওবা করতে ও মুহাম্মদের নির্দেশিত নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করে।

আমি যতই আয়াতগুলো পড়েছি, আরশের ধারণা ততই সমস্যাজনক মনে হয়েছে। বারবার আল্লাহর "আরশে প্রতিষ্ঠিত" হওয়ার বিষয়টি তাঁর কর্তৃত্বকে এমনভাবে স্থানিকভাবে বাঁধতে চাইছে, যা মানুষের রাজত্বের প্রতিচ্ছবি। অথচ দাবি করা হয়, আল্লাহ মানব বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। যদি আল্লাহ সত্যিই অসীম ও অতীন্দ্রিয় হন, তবে কেন তাঁকে রাজা-সুলভ সিংহাসনে বসা অবস্থায় বর্ণনা করা হচ্ছে? এটি ৭ম শতকের আরব সমাজের উপজাতীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন বলে মনে হয়, যেখানে ক্ষমতা ও আধিপত্য সিংহাসন ও শ্রেণিবিন্যাস দ্বারা প্রতীকায়িত হতো।

এছাড়া কোরআনের কিয়ামতের দিন সম্পর্কিত আরশকেন্দ্রিক বর্ণনাগুলো যুক্তির চেয়ে ভয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। আকাশভাঙা ও শাস্তির এই নাটকীয় দৃশ্য বিশ্বাসীদের অনুগত রাখার কার্যকর হাতিয়ার, কিন্তু এটি সমালোচনামূলক চিন্তার কোনো সুযোগ রাখে না। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, মুহাম্মদের প্রকাশিত ওয়াহীগুলোতে বারবার আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন তোলার বা গভীরভাবে বোঝার তাগিদ দেওয়া হয়নি। এটি প্রাচীন গ্রিক দর্শন বা আধুনিক যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সাথে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে, যেখানে প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোরআনের এসব আয়াতে আল্লাহর যে গুণাবলির কথা বলা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব, দয়া, ও জ্ঞান, সেগুলোকে একেবারে চূড়ান্ত ও অস্বীকারযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বারবার আরশ, সিংহাসন, ফেরেশতাদের অবিরাম প্রশংসা ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীলতা মনে হয় মুহাম্মদের নিজের কর্তৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বে বসা এমন এক সত্ত্বা, এই দাবি করে মুহাম্মদ নিজেকে সেই আল্লাহর দূত হিসেবে স্থাপন করেছেন, যাতে তাঁর অনুসারীরা প্রশ্ন ছাড়াই অনুগত থাকে। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এগুলো আসলেই কি ঐশ্বরিক, নাকি ক্ষমতা সুসংহত করার রাজনৈতিক কৌশল? ইতিহাসে মুহাম্মদের নেতৃত্ব অনেকাংশেই ধর্মীয় দাবিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মিশিয়ে কাজ করেছিল।

কোরআনের শিক্ষা নিয়ে যখন আমি চিন্তা করি, তখন লক্ষ্য করি আল্লাহর এমন কিছু বর্ণনা আছে, যেগুলো তাঁকে মানুষের মতো করে তুলে ধরে। এটি আমার কাছে অদ্ভুত, এমনকি সমস্যাজনক মনে হয়, কেন একটি পবিত্র গ্রন্থ একজন অসীম সত্ত্বাকে এমন দেহগত বৈশিষ্ট্য দিচ্ছে, যিনি আসলে রূপ ও আকারের ঊর্ধ্বে হওয়ার কথা?

প্রথমেই আসি আল্লাহর রঙ প্রসঙ্গে। এক আয়াতে বলা হয়েছে মানুষ আল্লাহর রঙ গ্রহণ করেছে এবং জিজ্ঞেস করা হয়েছে, আল্লাহর চেয়ে উত্তম রঙ আর কার হতে পারে (কোরআন ২:১৩৮)। এর মানে দাঁড়ায় আল্লাহর একটি বিশেষ রঙ আছে, ঠিক যেমন মানুষের গায়ের রঙ বা কোনো রঙিন বস্তু। অথচ যদি আল্লাহ সত্যিই অসীম ও আকারহীন হন, তবে কেন তাঁর সাথে রঙের মতো মানবীয় বৈশিষ্ট্য জুড়ে দেওয়া হচ্ছে?

এটি মনে হয় মুহাম্মদ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে ধার নিয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্তাকে বর্ণনা করেছেন। অথচ এটি আল্লাহকে তুচ্ছ ও মানবসদৃশ করে তোলে, যা তাঁকে মহিমান্বিত করার পরিবর্তে শিশুসুলভ কাহিনির চরিত্রে পরিণত করে।

তারপর আসে আল্লাহর কণ্ঠস্বর প্রসঙ্গ। এক আয়াতে বলা হয়েছে, মূসা এক উপত্যকায় পৌঁছালে ডান পাশের একটি গাছ থেকে আওয়াজ এলো, “আমি আল্লাহ, জগতের প্রতিপালক” (কোরআন ২৮:৩০)। অন্য এক আয়াতে মূসা আগুনের কাছে আসলে কণ্ঠস্বর শোনা যায়, আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে (কোরআন ২৭:৮)। এখানে দেখা যায়, আল্লাহ যেন সরাসরি কথা বলছেন, মানুষের মতো করে শোনাচ্ছেন। এটি পৌরাণিক কাহিনির মতো শোনায়, কোনো চিরন্তন সত্তার প্রকাশ নয়। এতে মনে হয় মুহাম্মদ সমসাময়িক সংস্কৃতির মিথ থেকে ধারণা নিয়ে নিজের ধর্মীয় কাহিনি রচনা করেছেন।

এছাড়া, কোরআনে বারবার বলা হয়েছে আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও দেখেন (কোরআন ৫৮:১, কোরআন ৪:১৩৪)। যদিও এটি সর্বজ্ঞতার প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু শোনা ও দেখা শব্দগুলো ইঙ্গিত দেয়, কানের ও চোখের মতো ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্বে। অথচ আল্লাহকে আকারহীন বলা হয়।

অবশেষে আসে আল্লাহর হাতের প্রসঙ্গ। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা বায়াত দেয় তাদের হাতের ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে (কোরআন ৪৮:১০)। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ইহুদিরা বলেছিল আল্লাহর হাত বাঁধা, কিন্তু কোরআন বলছে তাঁর হাত খোলা (কোরআন ৫:৬৪)। হাত থাকা মানে আবারও দেহগত বৈশিষ্ট্য। এখানেই স্পষ্ট হয়, মুহাম্মদ প্রতিপক্ষকে জবাব দিতে গিয়ে এমন চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন, যা আসলে আল্লাহকে মানবসদৃশ করে তোলে।

এরপর আসে আল্লাহর অনুভূতির প্রসঙ্গ। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ কিছু মানুষের প্রতি সন্তুষ্ট, আর তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট (কোরআন ৯৮:৮)। এটি পারস্পরিক সন্তুষ্টির মতো শোনায়, যা আল্লাহকে মানুষের মতো দেখায়, যেন তিনি মানুষের স্বীকৃতির প্রয়োজন অনুভব করেন। আবার সূরা গাফিরে বলা হয়েছে, যারা ঈমান আনেনি তাদের ওপর আল্লাহর রাগ মানুষের নিজের রাগের চেয়েও প্রবল (কোরআন ৪০:১০)। এটি আল্লাহকে এক ক্রুদ্ধ শাসকের মতো করে তুলে ধরে।

অবশেষে কোরআনে আল্লাহকে প্রতিশোধপরায়ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (কোরআন ৩:৪)। এতে আল্লাহকে এমন এক যোদ্ধার মতো মনে হয়, যিনি প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী। এর ফলে বিশ্বাস ভয়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়, ভালোবাসার ওপর নয়।

এই সব বর্ণনা আল্লাহকে মানুষের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হিসেবে তুলে ধরে, রঙ, কণ্ঠস্বর, চোখ-কান, হাত, রাগ, খুশি, ভালোবাসা বা ঘৃণা। এগুলো মুহাম্মদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন বলে মনে হয়, কোনো অতীন্দ্রিয় সত্য নয়। এর ফলে ইসলামের ঈশ্বর ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আল্লাহ কি সত্যিই অসীম ও আকারহীন, নাকি মুহাম্মদের গড়া মানবসদৃশ এক কল্পনা?

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন