কুরআন ও মুহাম্মদের সহিংসতা: ওসামা বিন লাদেনের আদর্শ

ইসলামের কেন্দ্রীয় ধর্মগ্রন্থ কুরআন মুসলিম সমাজে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বহন করে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন ও নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে, গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কুরআনের বহু অংশে এমন নির্দেশ রয়েছে, যা অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সহিংসতাকে সরাসরি বৈধতা প্রদান করে।

ইসলামপন্থী ব্যাখ্যাকারীরা প্রায়শই এসব আয়াতকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেন, বিশেষ করে মুহাম্মদের যুগে সংঘটিত প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করে দেখান। কিন্তু আয়াতগুলির ভাষা এতটাই কঠোর ও অনমনীয় যে, এগুলোতে একটি সুস্পষ্ট আগ্রাসী মনোভাব এবং মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবল ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এর ফলে ইসলামকে “শান্তির ধর্ম” বলে প্রচারের যে প্রচেষ্টা রয়েছে, তা আয়াতগুলির সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

একই সঙ্গে স্বাধীনতা, সমতা এবং মানবাধিকারের মতো আধুনিক মূল্যবোধের সঙ্গেও এসব শিক্ষা বিরোধ সৃষ্টি করে। কুরআনে আল্লাহ ও মুহাম্মদের বিরোধিতাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কার্যত ভিন্নমত দমন এবং সপ্তম শতকের গোত্রকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার জবরদস্তিমূলক মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে।

এই প্রতিবেদনে কুরআনের সহিংস আয়াতগুলির যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মুহাম্মদের নেতৃত্বাধীন ইসলামের মৌলিক অসহিষ্ণুতা ও আধিপত্যবাদ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাস থেকে নেওয়া বাস্তব উদাহরণগুলো দেখাবে কীভাবে এসব আয়াত কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনের বিপরীতে এর সহিংস ও দমনমূলক চরিত্রকে উন্মোচিত করা।

কুরআনে যুদ্ধ ও দমনের নির্দেশ

কুরআনে এমন বহু আয়াত রয়েছে, যা মুসলমানদের অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করে। সূরা আল-বাকারাহ (২:১৯১)-এ বলা হয়েছে: “তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো এবং যেখান থেকে তারা তোমাদের বিতাড়িত করেছে, সেখান থেকে তাদের বিতাড়িত করো।” এখানে আত্মরক্ষার সীমিত ইঙ্গিত থাকলেও সামগ্রিক ভাষা মৃত্যুদণ্ড ও বিতাড়নের নির্দেশ বহন করে। অনুরূপভাবে সূরা আত-তাওবাহ (৯:৫), যা “তলোয়ারের আয়াত” নামে পরিচিত, বহুদেবতাবাদীদের হত্যা, অবরোধ ও বন্দি করার স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করে, যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করে বা সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে। ঐতিহাসিকভাবে এ আয়াত মক্কা বিজয়ের সময় অমুসলিমদের ওপর বলপ্রয়োগ বৈধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

একই সূরার আরেকটি আয়াত (৯:২৯) আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়, যতক্ষণ না তারা জিজিয়া কর প্রদান করে এবং নিজেদের অধীনতা স্বীকার করে। এর মাধ্যমে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো একেশ্বরবাদীদেরও অধীনস্ত অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রবণতা স্পষ্ট করে যে ইসলাম সমতার ভিত্তিতে সহাবস্থানের পরিবর্তে একটি প্রভুত্ববাদী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।

কেবল বাইরের শত্রু নয়, কুরআনে মুনাফিক ও ভিন্নমতের মুসলমানদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধের নির্দেশ রয়েছে। সূরা আত-তাওবাহ (৯:৭৩)-এ নবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে লড়াই করতে। সূরা মুহাম্মদ (৪৭:৪)-এ বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে অবিশ্বাসীদের ঘাড়ে আঘাত করতে এবং তাদের বন্দি করে হয় হত্যা, নয় মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি দিতে। এসব নির্দেশ ইসলামপন্থী সামরিক নীতিকে কেবল বৈধই করেনি, বরং তা ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

কঠোর শাস্তি ও জবরদস্তিমূলক বিধান

শুধু যুদ্ধ নয়, কুরআনে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩৩)-তে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধীদের জন্য হত্যাযজ্ঞ, শূলে চড়ানো, হাত-পা কর্তন অথবা নির্বাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সূরার (৫:৩৮) আরেকটি আয়াতে পুরুষ ও নারী চোরের হাত কেটে ফেলার বিধান রয়েছে। এছাড়া সূরা আন-নূর (২৪:২)-এ ব্যভিচারের অপরাধে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একশো চাবুক মারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব বিধান আধুনিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। এখানে মানবিক পুনর্বাসন বা ন্যায়সংগত বিচার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কঠোর দণ্ডই প্রধান হিসেবে প্রতীয়মান।

ভয়, সন্ত্রাস ও দৈবিক প্রতিশোধ

কুরআনে ভয় প্রদর্শন ও দৈবিক প্রতিশোধের হুমকি আনুগত্য নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সূরা আল-ইমরান (৩:১৫১)-এ ঘোষণা করা হয়েছে: “আমরা অবিশ্বাসীদের অন্তরে সন্ত্রাস নিক্ষেপ করব।” সূরা আল-আরাফ (৭:৩–৫)-এ আল্লাহকে অবাধ্য করা সমাজ ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আবার সূরা আন-নিসা (৪:৮৯)-এ স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, যারা ইসলাম ত্যাগ করে তাদের ধরতে ও হত্যা করতে। এসব আয়াত ইসলামী শরিয়তে ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা ইতিহাসে বহুবার প্রয়োগ করা হয়েছে।

উপর্যুক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরআন ও মুহাম্মদের শিক্ষা আধ্যাত্মিক নির্দেশ নয়, বরং যুদ্ধ, সহিংসতা, দমন এবং অসহিষ্ণুতার এক শক্তিশালী ভিত্তি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি আধুনিক যুগেও এসব আয়াতের ব্যবহার দেখা যায়। এর ফলে ইসলামকে শান্তি ও মানবতার ধর্ম হিসেবে প্রচারের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। যুক্তিযুক্তভাবে বলা যায়, কুরআনের এই সহিংস দিক আসলে মুহাম্মদের যুগের উপজাতীয় সমাজব্যবস্থা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিফলন, যা আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক। এই কারণে ইসলাম ও মুহাম্মদের শিক্ষা বর্তমান বিশ্বের স্বাধীনতা, সমতা ও মানবাধিকারের আদর্শের জন্য এক বড় প্রতিবন্ধক।

জিহাদ এবং ওসামা বিন লাদেন

ওসামা বিন লাদেন, ইসলামি মৌলবাদের এক বিশিষ্ট ব্যক্তি, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেন। তার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল একটি দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা, মুসলিম বিশ্বকে কোরআনের তার ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে জিহাদবাদী ইসলামের অধীনে একত্রিত করা।

বিন লাদেন চেষ্টা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বোঝাতে যে তার বৈশ্বিক জিহাদের আহ্বান শুধু ন্যায়সঙ্গতই নয়, বরং ইসলামের শাস্ত্র দ্বারা নির্ধারিত, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ছিল।

১৯৯৬ সালের তার “যুদ্ধ ঘোষণা” তে বিন লাদেন যুক্তি দেন যে কোরআন স্পষ্টভাবে পশ্চিমের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জিহাদের অনুমোদন দিয়েছে। তিনি ইসলামি জাতিরাষ্ট্রগুলির অস্তিত্বকে, যারা কেবল নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ দেয় এবং অমুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সহাবস্থান করে, কোরআনের শিক্ষার থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখেছিলেন।

মুসলিম বিশ্বকে তার উদ্দেশ্যে আকৃষ্ট করতে, বিন লাদেন তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেন: প্রথমত, কোরআন সরাসরি জিহাদের সমর্থন করে তা দেখানো; দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ইসলামি নীতির পরিপন্থী তা প্রমাণ করা; এবং তৃতীয়ত, তার দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার ভিত্তিতে নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ খিলাফতের প্রেক্ষিতে উপস্থাপন করা।

তিনি তার ঘোষণার শুরু করেন মুসলমানদের “আল্লাহকে ভয় করতে” আহ্বান জানিয়ে এবং নির্দিষ্ট কোরআনিক আয়াত (কোরআন ৩:১০২, ৪:১, ৩৩:৭০-৭১) উদ্ধৃত করে তার যুক্তিকে ধর্মীয় কর্তৃত্বে ভিত্তি প্রদান করেন। এই আয়াতগুলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং ন্যায়পরায়ণ আচরণের উপর জোর দেয়, যা বিন লাদেন তার বার্তার জরুরিতা বোঝাতে ব্যবহার করেন।

তিনি আরও হজরত শুয়াইব (ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্যে জেথরো নামে পরিচিত)-এর উদাহরণ টেনে আনেন, যিনি কোরআনের বর্ণনায় অন্যায় সংশোধন এবং তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন (কোরআন ১১:৮৮)। শুয়াইবকে উল্লেখ করে বিন লাদেন সূক্ষ্মভাবে নিজেকে আধুনিক সমতুল্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি সমসাময়িক অন্যায় সংশোধন এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে ইসলামের প্রকৃত পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আহ্বানপ্রাপ্ত।

কোরআন এবং ইতিহাসের এই কৌশলগত ব্যবহার বিন লাদেনকে তার জিহাদবাদী মতাদর্শকে আল্লাহ প্রদত্ত মিশন হিসেবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে, যা বিদ্যমান মুসলিম সরকারগুলির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় (লরেন্স, ২০০৫)।

পরে বিন লাদেন ইসলামের প্রধান শত্রু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের দিকে মনোনিবেশ করেন, যাদের তিনি সম্মিলিতভাবে “ইহুদি-ক্রুসেডার আগ্রাসন জোট” নামে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন, এই জোট বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন, বৈরিতা এবং অন্যায় চালাচ্ছে।

তিনি তাজিকিস্তান, বার্মা, কাশ্মীর, আসাম, ফিলিপাইন, পাতানি, ওগাদেন, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া, চেচনিয়া এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সংঘাত ও নৃশংসতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এসব ঘটনা মুসলমানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জাগানো উচিত (বিন লাদেন, ১৯৯৬)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘের আড়ালে “স্পষ্ট সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্য” প্রদর্শনের অভিযোগ আনেন, যা তিনি অনৈতিক মনে করতেন।

এছাড়াও, তিনি সৌদি সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের “অনুমোদিত এজেন্ট” হিসেবে সমালোচনা করেন, বিশেষ করে ১৯৯০ সালে আমেরিকার ইরাকবিরোধী সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য। বিন লাদেনের মতে, সৌদি সহযোগিতা পশ্চিমা প্রভাব বিস্তার সহজ করে তোলে, যা ইসলামি স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা (কেপেল ও মিলেলি, ২০০৮)।

তার জিহাদের আহ্বানকে জোরদার করতে, বিন লাদেন ঐতিহাসিক ইসলামি আলেমদের লেখাকে কাজে লাগান, বিশেষ করে ১৩শ শতাব্দীর আলেম ইবনে তাইমিয়ার রচনা। তাইমিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে বিন লাদেন দাবি করেন, “জিহাদ হজ ও ওমরার চেয়ে উত্তম,” যা পবিত্র যুদ্ধকে অন্যান্য ধর্মীয় কর্তব্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় (ইবনে তাইমিয়া, ১৯৮৩)।

তিনি আরও কোরআনের আয়াত, বিশেষ করে “তলোয়ারের আয়াত” (কোরআন ৯:৫) উদ্ধৃত করে ইসলামবিরোধী শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেন। এসব উদ্ধৃতির মাধ্যমে বিন লাদেন তার জিহাদের আহ্বানকে আল্লাহর অনুমোদিত এবং ইসলামি ঐতিহ্যে ভিত্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।

ওসামা বিন লাদেনের জিহাদি ফতোয়া

১৯৯৮ সালে ওসামা বিন লাদেন একটি ফতোয়া জারি করেন, যা ছিল একজন ইসলামি আলেম কর্তৃক প্রদত্ত আইনগত মতামত, এবং এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার পূর্ববর্তী যুদ্ধ ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই ফতোয়া কোরআনের তলোয়ারের আয়াত (কোরআন ৯:৫) উদ্ধৃত করে শুরু হয়, যা তার প্রচারিত সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য ধর্মীয় ন্যায্যতা প্রদান করে।

বিন লাদেন তিনটি প্রধান কারণ দেখান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানানোর জন্য:

১. তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র পবিত্র ইসলামি ভূমি—বিশেষত আরব উপদ্বীপ—দখল করেছে, তার সম্পদ শোষণ করছে, তার নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, এবং জনগণ ও প্রতিবেশীদের মধ্যে অপমান ও ভয় ছড়াচ্ছে।

২. তিনি ইরাকি জনগণের ভয়াবহ কষ্টের দিকে ইঙ্গিত করেন, যা তার ভাষায় একটি “ক্রুসেডার-সায়োনিস্ট জোট”-এর কারণে, এবং যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরও নৃশংসতার পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ আনেন।

৩. তিনি যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখলকে রক্ষা করছে, যার ফলে মুসলিম স্বার্থের ক্ষতির বিনিময়ে ইসরায়েলের অস্তিত্ব টিকে আছে (বিন লাদেন, ১৯৯৮)।

বিন লাদেন এই কর্মকাণ্ডগুলোকে ইসলাম, তার নবী, এবং অনুসারীদের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জিহাদকে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা ইসলাম রক্ষার জন্য নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে ন্যায্য। তার যুক্তিকে শক্তিশালী করতে, তিনি ঐতিহাসিক ইসলামি আলেমদের, বিশেষত আল-কুরতুবি (১২১৪–১২৭৩), রচনার ওপর নির্ভর করেন, যিনি জোর দিয়েছিলেন যে ধর্ম ও জীবনের উপর আক্রমণকারী শত্রুকে প্রতিহত করা একটি পবিত্র কর্তব্য, যা ইসলামি আলেমদের দ্বারা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত।

আল-কুরতুবির মতে, ঈমান রক্ষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই, শুধুমাত্র সেই শত্রুর প্রতিরোধ ছাড়া, যে ধর্ম এবং অস্তিত্ব উভয়কেই হুমকি দেয় (বিন লাদেন, ১৯৯৮)।

ওসামা বিন লাদেনের ফতোয়া, যা বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে ছিল, ঘোষণা করে যে প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হলো আমেরিকান ও তাদের মিত্রদের হত্যা করা, হোক তা বেসামরিক বা সামরিক, যেখানেই এ কাজ সম্ভব হয় (লরেন্স, ২০০৫)।

এই নির্দেশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়, যা ইসলামি ঐতিহ্যে নবী মুহাম্মদের অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধা এবং অযোদ্ধা উভয়কেই লক্ষ্য করেছিলেন। এই নজির উল্লেখ করে বিন লাদেন তার সহিংসতার আহ্বানকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন। ফতোয়াকে জোরদার করতে তিনি পাঁচটি কোরআনিক আয়াত উদ্ধৃত করেন: সূরা ২:১৯৩, ৪:৭৫, ৮:২৪, ৯:৩৮-৩৯, এবং ৩:১৩৯, যেগুলো তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

বিশেষত সূরা ৩:১৩৯ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বাস করা হয় যে, ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের পর মুহাম্মদকে অবতীর্ণ করা হয়েছিল। এই আয়াত দৃঢ়তা এবং অধ্যবসায়ের উপর জোর দেয়, বোঝায় যে ব্যর্থতা সত্ত্বেও আল্লাহর উদ্দেশ্যে দৃঢ়ভাবে অটল থাকলে চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত। এই আয়াত উল্লেখ করে বিন লাদেন জিহাদিদের উদ্বুদ্ধ করতে চান, যাতে তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় থাকে।


Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন