কিভাবে বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বছর পর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান ১৯৭২ সালে গৃহীত হয়। এই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলোর একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রথমে রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর শাসনামলে সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে এগোতে শুরু করে। এই সময় স্কুলের পাঠ্যবই ধর্মনিরপেক্ষভাবে পরিবর্তন করা হয়, জাতীয় ব্যক্তিত্বদের নামে ভবন ও সড়কের নামকরণ করা হয় এবং কোরআন পাঠের মতো ধর্মীয় কার্যক্রম জনসমক্ষে সীমিত করা হয়।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্ভিক্ষ এবং স্থানীয়ভাবে ইসলামপন্থী আন্দোলনের চাপে শেখ মুজিব জনসমর্থন ধরে রাখতে ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে আবারও জনজীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেন। এর মধ্যে ছিল নতুন ইসলামিক জাতীয় ছুটির দিন চালু করা, মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করা, ইসলামি শিক্ষা ও চর্চায় সহায়তা দেওয়া এবং সরকারি রেডিও ও টেলিভিশনে কোরআন পাঠ পুনরায় চালু করা।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যার পর বাংলাদেশে শুরু হয় ১৫ বছরের স্বৈরশাসন, যেখানে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রে ইসলামীকরণ বেড়ে যায়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (১৯৭৬–১৯৮১) সরকার সরকারের নিয়মনীতি এবং রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জিয়াউর রহমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে “আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা” প্রতিস্থাপন করেন।

জিয়া সরকার সংবিধান থেকে "ধর্মনিরপেক্ষতা" শব্দটি মুছে ফেলে এবং এমন ইসলামপন্থী দলগুলোর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যারা স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের বিপক্ষে কাজ করেছিল, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামি অন্যতম। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, এবং তাঁর মিত্ররা তাদের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের মুসলিম পরিচয়কে জোর দিয়ে তুলে ধরেন।

১৯৮১ সালে জিয়ার হত্যার পর, জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামীকরণ আরও জোরদার করেন। ১৯৮৮ সালে এরশাদ ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন।

১৯৯০ সালে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে বর্তমান নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতির যুগ শুরু হয়। পরবর্তী ৩০ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম, দুই ধরণের মূল্যবোধই গ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০১১ সালে সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দটি পুনরায় যুক্ত করেন (যদিও ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল থাকে)। তিনি বহুবার প্রকাশ্যে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে সমর্থন করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব জনগণের ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক শাসনের প্রতি আগ্রহের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, জনগণ একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করে, তেমনি শরিয়ার বিধানের প্রতিও সমান সমর্থন দেখায়।

আন্তর্জাতিক জরিপ ও মতামত

২০১৭ সালে RESOLVE Network-এর কমিশন করা একটি জরিপে দেখা যায়, বেশিরভাগ বাংলাদেশি ব্যক্তি মালিকানার অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সুষ্ঠূ নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। তবে আরও বেশি মানুষ শরিয়ার বড় ভূমিকার পক্ষে মত দেয়, যার মধ্যে অপরাধের জন্য কঠোর শারীরিক শাস্তি এবং নারীদের জন্য জোরপূর্বক পর্দা বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়ও রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ বলেন, আইনি ব্যবস্থায় শরিয়ার “আংশিক” বা “বড়” ভূমিকা থাকা উচিত।

এই ফলাফল আগের জরিপগুলোর সাথেও মিলে যায়। ২০১৩ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৮২ শতাংশ বাংলাদেশি শরিয়াকে অফিসিয়াল আইন বানানোর পক্ষে। আর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ (৪৪ শতাংশ)—মতচ্যুতি (অর্থাৎ ইসলাম ত্যাগ করা) করাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

২০০৬ সালের গ্যালাপ জরিপে, ৯১ শতাংশ বাংলাদেশি বলেন, তারা চায় শরিয়া একমাত্র (অথবা অন্তত একটি) আইন প্রণয়নের উৎস হোক। এই তথ্যগুলো স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের ওপর মুসলিম বিশ্বের আরও ইসলামী মূল্যবোধ ও শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থার জনপ্রিয় চাহিদার প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশের মূলধারার সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা যত বাড়তে থাকে, একইসাথে সহিংস চরমপন্থারও জন্ম হয় এবং তা বাড়তে থাকে। গবেষক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সহিংস চরমপন্থীদের পাঁচটি “প্রজন্ম” চিহ্নিত করেছেন, যাদের ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের ধারণা ধীরে ধীরে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে।

প্রথম প্রজন্মের সহিংস চরমপন্থীরা গড়ে ওঠে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীকে হটিয়ে সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারকে উচ্ছেদ করার যুদ্ধে (আফগান জিহাদ) অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে কয়েক হাজার বাংলাদেশি আফগানিস্তানে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই যোদ্ধারা যখন বাংলাদেশে ফিরে আসে, তখন তারা ‘জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (JMB) নামের একটি সহিংস উগ্রপন্থী সংগঠন (Violent Extremist Organization, VEO) গঠন করে। এদেরকে বলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের চরমপন্থী। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ভেতরে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। JMB এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বোমা হামলা, আত্মঘাতী আক্রমণ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী ছিল।

২০০০ সালের শুরুতে তৃতীয় প্রজন্মের সহিংস চরমপন্থীরা মাথাচারা দিয়ে ওঠে, তারা আরও শহরভিত্তিক, মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং বুদ্ধিদীপ্ত। এরপর গঠিত হয় নতুন ধরনের চরমপন্থী দল, যেমন ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ (ABT), যেটি ‘আনসার আল-ইসলাম’ (AAI) নামেও পরিচিত, তারা গঠন করে চতুর্থ প্রজন্ম। এই গ্রুপগুলো ইন্টারনেটকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং নিজেদের মতবাদ ছড়াতে। এদের সঙ্গে ঢাকায় ২০১০-এর দশকের শুরুতে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার এবং LGBTQ কর্মীদের হত্যা করার ঘটনারও সংযোগ ছিল।

পঞ্চম এবং বর্তমান প্রজন্মের সহিংস চরমপন্থার উত্থান ঘটে ২০১৫ সালে। এদের লক্ষ্য শুধু দেশের ভেতরে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিস্তার। যেমন: আইএস (ISIS) এবং আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS) এর মতো সংগঠনগুলো বাংলাদেশিদের নিয়োগ করে সহিংসতার মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক খেলাফত এবং একইসাথে বাংলাদেশের মধ্যে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই প্রজন্মের বাংলাদেশি জঙ্গিরা, যারা আইএস-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তারাই ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকার গুলশানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হোলি আর্টিজান হামলা চালায়। বাংলাদেশে সক্রিয় প্রধান আন্তর্জাতিক VEO হলো আইএস (ISIS)। তারা ইসলামের কঠোর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে একটি বহুজাতিক খেলাফত গঠন করতে চায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইএস বাংলাদেশ অঞ্চলে একজন “আমির” (নেতা) নিয়োগ করেছিল এবং বাংলাভাষায় প্রপাগান্ডা (উসকানিমূলক প্রচারণা) ছড়িয়েছিল।

২০১৯ সালে আইএসের অনলাইন ম্যাগাজিন ও অন্যান্য প্রকাশনার একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের সদস্য সংগ্রহের ভাষ্য মূলত কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

তারা দাবি করে:

  • বাংলাদেশের সরকার অত্যাচারী এবং আল্লাহর ক্ষমতা নিজেরা দখল করেছে,
  • প্রধান ধর্মীয়-সংরক্ষণশীল বিরোধীদলগুলো যথেষ্ট মুসলিম নয়,
  • পশ্চিমা দেশগুলো ও অমুসলিমরা ইসলাম ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে।

আইএস-এর মতে, এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো: একটি বিশ্বব্যাপী খেলাফত এবং বাংলাদেশে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, আর তা করতে হবে কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী সহিংস জিহাদের মাধ্যমে।

আইএস বাংলাদেশের কয়েকটি সাম্প্রতিক হামলার জন্য দায় স্বীকার করেছে। ২০১৯ সালে তারা ছয়টি হামলার দায় নিয়েছিল, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল প্রধানত পুলিশের ওপর এবং সেগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছিল স্বনির্মিত বিস্ফোরক (IED)।

বাংলাদেশে সক্রিয় প্রধান আঞ্চলিক VEO হলো AQIS (আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট), তাদের লক্ষ্য হলো আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা। AQIS ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের কয়েকজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারকে হত্যার দায় স্বীকার করে।

২০১৯ সালে AQIS-এর সদস্য সংগ্রহ পদ্ধতি নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, তারা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে চারটি মূল বার্তা দিয়ে:

  • ভারত একটি বিপজ্জনক ধর্মনিরপেক্ষ ও হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ছড়াচ্ছে,
  • বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার,
  • নারীরা ধর্মীয় যোগ্যতা না থাকায় নেতৃত্বের উপযুক্ত নয়,
  • বাংলাদেশে ধর্মীয় আইন ও সামাজিক ধর্মীয়তা যথেষ্ট নেই।

এইভাবে AQIS তরুণদের নিজেদের মতাদর্শে আকৃষ্ট করতে চায়। বাংলাদেশে কয়েকটি ছোট আকারের দেশীয় সহিংস উগ্রপন্থী সংগঠন (VEO) সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি হলো নিও-জেএমবি (Neo-JMB) এবং এবিটি/এএআই (ABT/AAI)। এই সংগঠনগুলোর মধ্যে অনেকেরই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ABT/AAI-কে AQIS (আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট)-এর সহযোগী হিসেবে ধরা হয়, আর নিও-জেএমবি, যেটি এখন বিলুপ্ত পুরনো JMB-র একটি নতুন শাখা, সেটি আইএস (ISIS)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানা যায়।

অমুসলিমদের হয়রানি ও হামলার শিকার হওয়া

বাংলাদেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন অমুসলিম সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু ও বৌদ্ধদের, ওপর পরিচালিত পরিকল্পিত সহিংসতার একটি ধারাবাহিকতা নথিভুক্ত করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২০ সালে ৬৭টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যেগুলো হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির বা দেবতার মূর্তির ওপর চালানো হয়েছিল। এছাড়াও, হিন্দুদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এক ডজনের বেশি হামলা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি ২০২১ সালে ৫৭টি “ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা”-সম্পর্কিত ঘটনা রেকর্ড করেছে। অধিকার নামে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫৮৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যেগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, মারধর, অপহরণ, ধর্ষণ, জমি দখল ও মন্দির ভাঙচুরের মতো নির্যাতনের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই সাম্প্রতিক সহিংসতা আসলে দশক-ব্যাপী একটি শত্রুতা ও বৈষম্যের ধারাবাহিকতা, যা অনেক সময় নির্বাচনী রাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রতা, এবং হিন্দু-অধ্যুষিত ভারত ও বৌদ্ধ-অধ্যুষিত মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে জড়িত।

সম্প্রতি হিন্দুদের ওপর হামলার পর, বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিবিসিকে বলেন: “বাংলাদেশে হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও জমি দখল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ হচ্ছে, আর মানুষজনকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।”

গত এক দশকে, কিছু ঘটনা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে উৎসাহিত সহিংসতার প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে।

২০১২ সালের কক্সবাজারের ফেসবুক-উদ্ভূত হামলা। এই ধরনের প্রথম বড় ঘটনা ঘটে ২০১২ সালে কক্সবাজারে, চট্টগ্রাম বিভাগে। একজন বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি জ্বালানো কোরআনের ছবি পোস্ট করা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্রতিবাদ, মিছিল শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়।

একদল মুসলিম যুবক ওই বৌদ্ধ যুবকের গ্রামে এসে তার গ্রেফতার দাবি করে। এই জমায়েত দ্রুত দাঙ্গায় পরিণত হয়। প্রায় ২৫,০০০ মুসলমান একত্র হয়ে অন্তত ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করে, এবং ৫০টি বাড়ি লুট বা ধ্বংস করে দেয় কয়েকটি বৌদ্ধ গ্রামে।

এই ঘটনার পর, বিভিন্ন সময় ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর দাঙ্গা হয়েছে। ২০১৪ সালে কুমিল্লায়, প্রায় ৩,০০০ মুসলমান একটি হিন্দু গ্রামে হামলা করে, মন্দির ধ্বংস করে এবং কমপক্ষে ৩৮টি পরিবারে ভাঙচুর করে। যাদের নেতৃত্বে ছিল মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা।

২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, আবার একটি হিন্দু সম্প্রদায়ে হামলা হয়। প্রায় ১০০টি বাড়ি, ৫টি মন্দিরে হামলা, চুরি ও হিন্দু বাসিন্দাদের মারধর করা হয়।

২০১৯ সালে বরিশালের ভোলায়, একজন হিন্দু পুরুষ ইসলামকে অপমান করেছে এমন অভিযোগে একটি জনতা তাকে ধরে মারার জন্য জড়ো হয়। এতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৪ জন মারা যায়।

২০২১ সালের অক্টোবরে, সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হিন্দু-বিরোধী সহিংসতা হয় বাংলাদেশজুড়ে। মুসলিম জনতা কয়েকদিন ধরে হিন্দু মন্দির ও ঘরে হামলা চালায়, অন্তত ২ জন নিহত হন।

এই সহিংসতা দুটো ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন হিন্দু দেবতার পায়ের ওপর একটি কোরআন রাখা হয়েছে, ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। আরেকটি পোস্টে একজন হিন্দু পুরুষ ইসলামকে অপমান করেছেন। এর আগে একই বছর, হেফাজতে ইসলাম নামের একটি জঙ্গি (রাজনৈতিক) সংগঠন একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টে বিরক্ত হয়ে ৮০টি হিন্দু ঘর ধ্বংস করে।

এই ঘটনাগুলো দেখায় যে, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট কতটা ভয়াবহ সহিংসতার রূপ নিতে পারে, এবং সংখ্যালঘুরা কীভাবে ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

যৌন সংখ্যালঘুদের (LGBTQ++) বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ ও সহিংসতা

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের একটি বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুরা। বিশেষ করে ২০১৬ সালে কয়েকজন সমকামী অধিকারকর্মী নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের হত্যার সংখ্যা কমেছে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর মূল কারণ হল এলজিবিটিকিউ ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মরক্ষামূলক স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা আর প্রকাশ্যে কথা বলেন না বা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকেন না।

একাধিক গবেষণা এবং প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা প্রতিনিয়ত পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বর্জন, যৌন হয়রানি এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ ব্যক্তিরা পরিবার থেকেই সহিংসতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হন। অপরিচিত মানুষ এবং এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকেও তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হন। তাদের অনেকেই আবাসন, কর্মসংস্থান, চিকিৎসাসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের সম্মুখীন হন।

এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক সময় এই সহিংসতা ও ঘৃণার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। একজন জরিপে অংশগ্রহণকারী মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষ ইসলামি চিন্তায় এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে অন্য কিছু ভাবার সুযোগই রাখে না।”

২০১৫ সালের পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোর সঙ্গেও এই তথ্যগুলোর মিল পাওয়া যায়। এসব গবেষণায়ও দেখানো হয়েছে, কীভাবে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা চালানো হয়। সম্প্রতি, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘৃণার প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা জানান, গে, লেসবিয়ান, বাইসেক্সুয়াল ও কুইয়ার মানুষদের লক্ষ্য করে করা ঘৃণা-ভাষণ দিন দিন আরও সহিংস এবং বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এসব বক্তব্যে প্রায়ই ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে সহিংসতা, অপমান এবং হয়রানিকে যৌক্তিক বলে তুলে ধরা হয়।

এ অবস্থায়, অধিকাংশ এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং একটি স্থায়ী উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সকল নাগরিক, তাদের লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় যাই হোক না কেন, সমান অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে।

বাংলাদেশের আইনশৃখলা, আদালত ও সরকারের জঙ্গি উৎসাহ:

বর্তমানে বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (আইন নং XLV, ১৮৬০) এর অধ্যায় XV ধর্ম সম্পর্কিত অপরাধের বিষয়ে বর্ণনা করে। এর ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ পর্যন্ত বিস্তরিত যেখানে ধর্ম অবমাননার শাস্তি ২ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা। এই ধর্ম অবমাননা যেকোনো ভাবেই হতে পারে, মৌখিক, লিখিত অথবা কোনো কর্মকান্ড।

সম্প্রতি হাইকোর্টের দুই বিচারপতি, রেজাউল হাসান এবং ফাহমিদা কাদের, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানসহ আইন প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন এবং এই অপরাধকে জামিন অযোগ্য করার সুপারিশ করেছেন। এই পরামর্শ এসেছে সেলিম খান নামে এক যুবকের জামিন শুনানির সময়, যিনি ফেসবুকে নবী মুহাম্মদ ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

কট্টর ইসলামি গোষ্ঠী ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে ধর্ম অবমাননা আইনের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবির বলেন, এই দাবির পেছনে রাজনৈতিক ইসলামের মতাদর্শ রয়েছে। হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ নেতারা এই ইস্যুতে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, কারণ এটি স্পর্শকাতর।

ডয়চে ভেলে ঢাকা রিপোর্ট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তিন বাহিনীর উপস্থিতিতেই গণপিটুনি

খুলনায় ১৬ বছরের কিশোর উৎসব মণ্ডলের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার কথিত কটূক্তির পর বুধবার কোচিং সেন্টারে আটক হলে তার বাবা তাকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখান থেকে পুলিশের পরামর্শে সোনাডাঙা থানায় এবং পরে উপ-পুলিশ কমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। উত্তেজিত জনতা, মূলত মাদ্রাসার ছাত্ররা, কার্যালয় ঘেরাও করে এবং রাত ১১টার দিকে গেট ভেঙে কিশোরকে পিটুনি দেয়। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর উপস্থিতিতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

প্রাথমিকভাবে কিশোরকে মৃত ঘোষণা করা হলেও পরে জানা যায়, সে বেঁচে আছে এবং সেনা হেফাজতে চিকিৎসাধীন। তার পরিবারকেও নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তাজুল ইসলাম জানান, গণপিটুনি ও কটূক্তির অভিযোগে মামলা হবে, তবে জনতার কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জনতা আইনের আশ্বাসের পরও “নিজেদের আইনে” বিচারের দাবি জানায়।

মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয়রা এই ঘটনাকে আইনের শাসনের ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার ফল হিসেবে দেখছেন। কিশোরের অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও গণপিটুনি ঘটেছে, যা সমাজে অশনি সংকেত বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্ত না হওয়ায় কটূক্তির অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়।

বুধবার নভেম্বর ২০, ২০২৪: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধে শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার পরামর্শ হাইকোর্টের:

হাইকোর্ট ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এই অপরাধকে জামিন অযোগ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরামর্শটি বিচারপতি এম আর হাসান ও ফাহমিদা কাদেরের বেঞ্চ ১২ মার্চ ২০২৫ রায়ে দিয়েছিলেন, যার পূর্ণাঙ্গ রায় বুধবার প্রকাশিত হয়।

কুষ্টিয়ার সেলিম খানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, দাঙ্গা সংগঠন, ইসলামি বিশ্বাস অবমাননা ও ফেসবুকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের হয়। বর্তমানে এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, এবং এটি জামিনযোগ্য।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, উসকানিমূলক ও ধৃষ্ট বক্তব্য বা আচরণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান থাকা উচিত এবং এই অপরাধগুলো অজামিনযোগ্য করা প্রয়োজন, যা সংসদ বিবেচনা করতে পারে। আদালত সুপারিশ করেছে যে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-কে অন্তর্ভুক্ত করেছে, কুরআন, নবী মুহাম্মদ এবং অন্যান্য সকল ধর্মীয় ধর্মগ্রন্থ অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি এটিকে জামিন অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত।

বাংলাদেশকে আফগানিস্তানে রূপান্তরের কামনা:

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ১ জুন ২০২৫ তারিখে কুখ্যাত ইসলামিক চরমপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনের নিবন্ধন পুনর্বহাল করার নির্দেশ দিয়েছে, যেটি ২০১৩ সাল থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ ছিল।

চূড়ান্ত রায়টি এখন এ দলকে আবারও একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কাজ করতে এবং সম্ভাব্যভাবে ভবিষ্যতের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। এই নিবন্ধন পুনর্বহালের সিদ্ধান্তটি এসেছে ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর, যখন ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারবিরোধী হিংসাত্মক প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

আফগানিস্তানের মতোই বাংলাদেশে তালিবানি শাসনের ছায়া পড়তে শুরু করেছে। সবকিছু দেখেও চোখ বন্ধ করে থাকার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল বিজয়ী ডঃ ইউনূসের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে উগ্র ইসলামি দল জামায়াত যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামায়াত-চরমোনাই জোটের এক শীর্ষ নেতা ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে তালিবানি আফগানিস্তানের আদলে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ের শুরুতেই বাংলাদেশের একাধিক বাজারে মহিলাদের চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছিল গোপালগঞ্জ বাজার। সেখানে মৌলবাদীরা মহিলাদের বাইরে বের হওয়ার উপর ফতোয়া জারি করেছিল। 

জামায়াতের এক নেতা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যে দাবিগুলো করেছেন, তা কার্যকর হলে বাংলাদেশ দ্বিতীয় আফগানিস্তানে পরিণত হবে। এর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। জামায়াত-চরমোনাই জোটের নেতা দাবি করেছেন, মহিলাদের গৃহবন্দি করা হবে, রাস্তায় একা চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হবে, বোরখা পরা বাধ্যতামূলক করা হবে, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করা হবে। মহিলাদের পড়াশোনা নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বললেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, গৃহস্থালির কাজ শেখা মহিলাদের জন্য পড়াশোনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গত ১ জুলাই, ২০২৫ আমেরিকা-প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন জামায়াত-চরমোনাই জোটের নেতা পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে শরিয়া আইন চালু করা হবে। উগ্র ইসলামপন্থী নেতা করিম দাবি করেন, নতুন সরকার গঠিত হলেই শরিয়া আইন কার্যকর হবে। তিনি জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের মডেল অনুসরণ করেই বাংলাদেশ সরকার কাজ করবে। নতুন সংবিধান রচনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে। কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকেই এর সূত্রপাত। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও বাংলাদেশে ক্রমশ উগ্র ইসলামবাদী মানসিকতা বাড়ছে।

২০১৩ সাল থেকে ইসলামি জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পায়, যাতে নাস্তিক ব্লগার, বিদেশি, উদারপন্থী ও সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রেখেছে এবং মাদ্রাসা ডিগ্রিকে স্নাতক ডিগ্রির সমতুল্য করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের পরামর্শ রাজনৈতিক ইসলামের গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

চলুন কিছু অতীত ও সাম্প্রতিক ঘটনা দেখে আসি

২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াতে ইসলামীর উপর নিষেধাজ্ঞার দাবিতে। ১৫ জানুয়ারি, নাস্তিক ব্লগার আসিফ মোহিউদ্দিনকে মতিঝিলে ছুরিকাঘাত করে হত্যার চেষ্টা করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ১৫ ফেব্রুয়ারি, শাহবাগের সংগঠক ও ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার মিরপুরে কুপিয়ে খুন হন। ২ মার্চ, পাঁচজন আনসারুল্লাহ সদস্য গ্রেফতার হয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে। ৭ মার্চ, শাহবাগ কর্মী সানিউর রহমান মিরপুরে চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত হন। 

২০১৪-এ উগ্রবাদী হামলা অব্যাহত থাকে। ১৫ নভেম্বর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাউল সংস্কৃতির অনুরাগী শফিউল ইসলামকে হত্যা করে আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ। তারা মিথ্যাভাবে দাবি করে শফিউল বোরকা নিষিদ্ধ করেছিলেন, যদিও তিনি শুধু পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধে মুখ ঢাকা বোরকা সীমিত করেছিলেন। “ডিফেন্ডারস অব ইসলাম” ৮৪ জন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তির হিট লিস্ট প্রকাশ করে, যার মধ্যে ৯ জন পরে নিহত হন।

২০১৫-এ ব্লগার ও প্রকাশকদের উপর হামলা চরমে ওঠে। ২৬ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশি-মার্কিনি ব্লগার অভিজিৎ রায়কে ঢাকার বইমেলার কাছে কুপিয়ে হত্যা করা হয়; তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ গুরুতর আহত হন। ৩০ মার্চ, তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান খুন হন। ১২ মে, সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হন। ৭ আগস্ট, নিলয় চট্টোপাধ্যায় ঢাকার বাসায় খুন হন। ৩১ অক্টোবর, অভিজিৎ রায়ের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন কুপিয়ে নিহত হন। আল-কায়েদা ও আইএসআইএল এসব হামলার দায় স্বীকার করে।

২০১৬-এ হামলার পরিধি বাড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারি হিন্দু পুরোহিত যোগেশ্বর রায়, ২৫ এপ্রিল এলজিবিটি কর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়, ৩০ এপ্রিল হিন্দু দর্জি নিখিল জোয়ারদার, ৭ মে সুফি মুসলিম শাহিদুল্লাহ, ১৪ মে বৌদ্ধ ভিক্ষু শুয়ে ইউ চাক, ২০ মে গ্রামীণ চিকিৎসক সনাউর রহমান, ২৫ মে হিন্দু ব্যবসায়ী দেবেশ প্রামাণিক, ৭ জুন হিন্দু পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী, ১০ জুন হিন্দু মঠকর্মী নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে, ১ জুলাই হিন্দু মন্দিরকর্মী শ্যামানন্দ দাস এবং হলি আর্টিজান বেকারিতে ১৭ বিদেশিসহ ২৮ জন নিহত হন। ২ জুলাই পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হন। পরবর্তী অভিযানে ১১,০০০ জন গ্রেফতার হলেও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, যা বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলার বেহাল অবস্থা আর চরমপন্থীদের উত্থানের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ ছিল। 

২০১৭ সালের ১৭ মার্চ, ঢাকার নির্মাণাধীন র‍্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলায় দুজন আহত হন। ২৪ মার্চ, ঢাকা বিমানবন্দরে পুলিশ চেকপোস্টের বাইরে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে আইএস দায় স্বীকার করে। ২৫ মার্চ, দক্ষিণ সুরমায় নিরাপত্তা অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে চার বেসামরিক, দুই পুলিশ ও চার জঙ্গি নিহত, প্রায় ৪০ জন আহত হন। আইএস দায় নিলেও সরকার জেএমবি-কে দায়ী করে। ৩ এপ্রিল, উত্তরায় এক সুফি নেতা ও তার কন্যাকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

বিবিসি বাংলা রিপোর্ট: ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারিতে শত শত মানুষ শহিদুন্নবী জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং পরে তার মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ঘটনার সূত্রপাত হয় মসজিদে আসরের নামাজের পর। গুজব ছড়ায় যে ঐ ব্যক্তি কোরআন অবমাননা করেছেন। অভিযোগ ছিল, তিনি শেলফে পা দিয়েছেন, যেখানে কোরআন শরীফ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই গুজব ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত জনতা তাকে ধরে ফেলে। স্থানীয় একজন ইউপি মেম্বার ওই ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে আটকে রাখলেও, পুলিশ আসার আগেই জনতা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দুজন লোক ছিল; একজনকে পুলিশ রক্ষা করলেও অপরজনকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং পরে মৃতদেহটি পুড়িয়ে ফেলে।

৪ঠা অক্টবর ২০২২ ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় জাইমা ইসলাম লিখছেন, এ বছর একদিকে হিন্দুদের ২২টি ধর্মস্থান আক্রান্ত হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত: ৭ জনকে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্টে গ্রেফতার বা মামলা করা হয়েছে। তিনি শ্রীমঙ্গলের প্রীতম দাশের কথা বলেছেন, মুন্সিগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় মন্ডল এবং নড়াইলের শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এপ্রিলে কৌশিক বিশ্বাস ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার ও বাগেরহাট মোরেলগঞ্জে এক হিন্দুর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া এবং নড়াইলের দিঘলিয়া সাহাপাড়া এক কিশোরের ফেইসবুক পোষ্টের কারণে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া ও পিতা-পুত্রকে গ্রেফতারের কথা বলেছেন। ঝুমন দাসের প্রসঙ্গ ছিলো। সাতক্ষীরার আশাশুনি গ্রামের মিহির মন্ডল সেপ্টেম্বরে ভীত হয়ে নিজেই পুলিশে কাছে ধরা দিয়েছেন।

সময় নিউজ ৯ই সেপ্টেম্বর ২০২২ জানায়, ফেইসবুকে ধর্মীয় উস্কানি দেয়ায় মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল পৌরশহর থেকে প্রীতম দাস নামে এক যুবককে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনা নিশ্চিত করেছে। বিআইএইচসি জানিয়েছে, চাঁদপুরের শাহরাস্তির বলশীদ হাজি ইয়াকুব আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক অখিল দেবনাথকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। জুলাই’র ৬ তারিখ ঠাকুরগাঁও উপজেলার শিবগঞ্জ বাজারে নবী মুহাম্মদ কে কটুক্তি করার অভিযোগে সাধারণ জনগণ নির্মল রায় কে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে। ২৯ জুন ২০২২ রাশেদ খান মেনন লিখেন, শিক্ষককে তো জুতার মালা পরানো কিংবা মেরে ফেলাই যায়!

এপ্রিল ২০২২, এ বেশ ক’টি ঘটনা ঘটে, মিডিয়া জানায়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ইসলাম ধর্ম ও মোহাম্মদ কে কটুক্তি ও অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে কৌশিক বিশ্বাস নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ১১ এপ্রিল রাতে মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের আমরবুনিয়া গ্রাম থেকে কৌশিককে আটক করা হয়। ঢাকা টাইমস ২০শে এপ্রিল জানায়, ফেনীতে ছাত্রীর বোরকা নিয়ে কটূক্তি, শিক্ষক পরিমল বরখাস্ত। প্রথম আলো ২৪শে এপ্রিল জানায়, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করায় বরিশালে আদালত ‘বাপন দাস-কে’ ৮ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে।

মার্চ ২০২২-তে ফেইসবুকে ধর্মানুভুতিতে আঘাত পোষ্ট নিয়ে খুলনায় উত্তেজনা, এক ব্যক্তি গ্রেফতার। ২২শে মার্চ ক্লাশে ইসলাম ধর্ম ও নবীকে অবমাননার অভিযোগে শিক্ষক আটক হয়েছেন। ২৫শে মার্চ ২০২২ হরিপুর, হোগলপাশা, মোড়েলগঞ্জ, বাগেরহাটে হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বলিয়ে দেয়া হয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছেন চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম। হতভাগ্য ভিকটিমের নাম দীপক কুমার মাঝি। তুষার মজুমদার নামে অপর একজনকে গ্রেফতার করা হয় কোরান অবমাননার অভিযোগে।

ঢাকনিউজ২৪ডটকম হেডিং করেছে, ‘কপালে টিপ্ পড়ায় শিক্ষিকার গায়ে বাইক তুলে দিলো পুলিশ’। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষিকা লতা’র ঘটনা পুরো দেশে আলোড়ন তুলে, তিনি বেঁচে গেছেন। ঢাকার সরকারি কলেজের শিক্ষিকা রুমা সরকার রক্ষা পাননি, পুলিশ তাঁকে মধ্যরাতে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়, ক’দিন জেল খাটেন। বছরের শুরুতে জানুয়ারি ২০২২-এ জানা যায়, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট তালুক শক্তি হাইস্কুলের শিক্ষক পবিত্র রায়কে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে।

২০২৩, ৩রা জানুয়ারি সিলেটে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে ধর্ম অবমাননার দায়ে রাকেশ রায়-কে ৭ বছর কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত, সাথে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড। বরিশাল লঞ্চঘাটে ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে খেয়ে পয়সা না দিয়ে দাঁড়িতে টান দিয়ে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ এনে দোকান ভাংচুর, লুটপাট হয়েছে, পুলিশ দোকানিকে থানায় আটক করেছে। 

ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করায় মাসুদ রানা নামের এক যুবককে আটক করেছে মিঠাপুকুর থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২০ জানুয়ারি, ২০২২) ভোরে মিঠাপুকুর উপজেলার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত মাসুদ রানা উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গোসাইহাট বাজার এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

জানা গেছে, মাসুদ রানা তার নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ম ও রাষ্ট্র নিয়ে বিদ্বেষমূলক পোস্ট দিয়ে উষ্কানি ছড়িয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার ইসলাম ধর্ম নিয়ে ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি অবমাননাকর পোস্ট দেন । বিষয়টি নজরে এলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ধরনীগঞ্জ বাজারে শ্রী বিজয় দাস (২৪) নামে এক যুবককে ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে এলাকাবাসী আটক করে তাকে মারধর করে এবং পুলিশে সোপর্দ করে। ঘটনাটি ঘটে ২ মে ২০২৫, শুক্রবার দুপুরে। বিজয়কে কয়েক ঘণ্টা আটক রাখার পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, বিজয় ইসকনের সঙ্গে যুক্ত এবং তার ফেসবুক আইডি থেকে কটূক্তিমূলক পোস্ট এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী সন্ধ্যায় ডোমার বাজারের প্রধান সড়ক এক ঘণ্টা অবরোধ করে বিজয়ের শাস্তির দাবি জানায়। ডোমার থানার ওসি মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বিজয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে, যাতে ৪-৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিও আসামি। বিজয়কে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

ঝিনাইদহে এম. এ. সাঈদ ওরফে (জ্যোতিষ সাঈদ ৬৭) নামে এক ব্যক্তিকে ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সোমবার রাতে ঢাকার সাভার থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (৩ মে, ২০২৫) তার পোস্ট ভাইরাল হলে ঝিনাইদহ ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। ক্ষুব্ধ জনতা তার পাগলাকানাই এলাকার কার্যালয় ঘিরে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সড়কে অগ্নিসংযোগ করে।

পুলিশ সুপারের নির্দেশে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল, সদর থানা ও ঢাকার সিটিটিসি’র যৌথ অভিযানে সাঈদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মো. ইসমাইল হোসেন বেলালী বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

লালমনিরহাটে পরেশ চন্দ্র শীল (৬৯) ও তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র শীল (৩৫), পেশায় নাপিত, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২২ জুন ২০২৫, স্থানীয় ইমামের নেতৃত্বে উত্তেজিত জনতার মারধরের শিকার হন এবং পুলিশে সোপর্দ হন। সদর থানার ওসি নুরনবী জনতাকে প্রকাশ্যে “যাবজ্জীবন বা ফাঁসি” নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান এই বক্তব্যকে পুলিশের নিরপেক্ষতা হারানোর প্রমাণ হিসেবে দেখেন।

অভিযুক্তরা ও তাদের পরিবার দাবি করে, ধর্ম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটেনি; চুল কাটার ১০ টাকা নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। পুলিশ তদন্তে ধর্ম অবমাননার প্রাথমিক অভিযোগ পেলেও বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ওসিকে সতর্ক করেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত বলে জানিয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা মনীন্দ্র নাথ মনে করেন, এই ঘটনা আইনের শাসনের ব্যর্থতা প্রকাশ করে। তারা মব-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযুক্তদের মুক্তির দাবি জানান। বর্তমানে পরেশ ও বিষ্ণু কারাগারে রয়েছেন, এবং জামিনের আবেদন এখনো করা হয়নি।

কালের কণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক ১০ জুন, ২০২৫: মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার দক্ষিণ জামশা গ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ আত্মহত্যা করেছেন। ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিষয়ে একটি পোস্টে মন্তব্য করার পর স্থানীয় কিছু লোক তাকে ও তার পরিবারকে হুমকি দেয়। এই চাপের কারণে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

পুলিশের দাবি, শাকিল ফেসবুকে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেছিলেন, যা সম্প্রতি ভাইরাল হলে পারিবারিক মানসম্মান ও আত্মোপলব্ধির কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন। সিংগাইর থানার ওসি তৌফিক আজম জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, শাকিলের পুরনো মন্তব্য ভাইরাল হওয়ায় তিনি এই পদক্ষেপ নেন।স্থানীয় সূত্র জানায়, সাত-আট মাস আগে করা তার মন্তব্য মুছে ফেলা হলেও, সম্প্রতি তা আবার ভাইরাল হয়। এরপর স্থানীয় কিছু লোক তার বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেয়, এবং রাত ২টার দিকে শাকিল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

প্রিয় পাঠক, কি মনে হয় আপনাদের, কোন বাংলাদেশে আপনারা থাকছেন। এখনই সময় রুখে দাঁড়ানোর এইসব চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে, তা না হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক স্টেট অফ বাংলাদেশ হয়ে যাবে।

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন