ইসলামিক শরিয়া আইন একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন

বাংলাদেশ, একটি গণতান্ত্রিক ও বহুসংস্কৃতির দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি এবং সংস্কৃতির মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে। তবে, ইসলামিক শরিয়া আইনের প্রয়োগ বা এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দেয়। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করবো কেন শরিয়া আইন বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে, বিশেষ করে এর সামাজিক, আইনি এবং অর্থনৈতিক পরিণতির দিক থেকে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি মূল নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে।

শরিয়া আইন, যা প্রধানত ইসলামিক ধর্মীয় বিধানের উপর ভিত্তি করে, ধর্মনিরপেক্ষতার এই নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা দেশের সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

শরিয়া আইনের কিছু ব্যাখ্যা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগ করে, যেমন উত্তরাধিকারে অসম বণ্টন, বিবাহ এবং তালাকের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রাধান্য, এবং পোশাক বা চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশে, যেখানে নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং রাজনীতিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে, শরিয়া আইনের প্রয়োগ এই অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে।

চলুন দেখেনেই কেন শরিয়া আইন মানবাধিকার বিরোধী:

ইসলামিক শরিয়া আইন, কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে গঠিত যা ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার জন্য একটি ঐশ্বরিক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপিত হয়। শরিয়ার আইনি বিধান এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ সর্বজনীন মানবাধিকার নীতির সাথে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। এর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। ঐতিহাসিক গ্রন্থ, আধুনিক কেস স্টাডি এবং মানবাধিকার কাঠামোর উপর ভিত্তি করে, এই নিবন্ধ শরিয়ার মৌলিক ত্রুটি এবং মানুষের মর্যাদা, সমতা এবং স্বায়ত্তশাসনের উপর এর বিধ্বংসী প্রভাব উন্মোচন করে।

ইসলামিক শরিয়া আইন, কুরআন, সুন্নাহ এবং শতাব্দীপ্রাচীন আইনবিদদের ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে গঠিত, এর সমর্থকদের দ্বারা একটি ব্যাপক নৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। তবে, ইতিহাস জুড়ে এবং আধুনিক রাষ্ট্রগুলিতে এর প্রয়োগ একটি কাঠামো প্রকাশ করে যা প্রায়শই মানবতার মূল নীতি, মর্যাদা, সমতা এবং স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করে। শরিয়া আইন ও এর নির্দেশমূলক কঠোরতা এবং শাস্তি সমূহ সর্বজনীন মানবাধিকারের সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (UDHR) সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: ন্যায়বিচারের ছদ্মবেশে বর্বরতা

শরিয়ার শাস্তি আইন, যা হুদুদ নামে পরিচিত, এমন শাস্তি নির্ধারণ করে যা কেবল কঠোর নয়, বরং মানব মর্যাদার সাথে মৌলিকভাবে বিরোধী। চুরি, ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মনিন্দার মতো অপরাধের জন্য শাস্তি হিসেবে হাত কাটা, পাথর মেরে হত্যা, বেত্রাঘাত এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই শাস্তিগুলি, ইসলামিক গ্রন্থের মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে (যেমন, চুরির জন্য কুরআন ৫:৩৮, ধর্মত্যাগের জন্য সহিহ আল-বুখারি ৮.৮২.৮০৫), এমন একটি বিশ্বদৃষ্টি প্রতিফলিত করে যা পুনর্বাসন বা সমানুপাতিকতার পরিবর্তে ভয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধকে প্রাধান্য দেয়।

শরিয়ার একটি প্রধান প্রয়োগকারী দেশ সৌদি আরবে, প্রকাশ্য মাথা কাটা এবং অঙ্গচ্ছেদ এখনও নিয়মিত ঘটে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরবে ১,০০০টি মৃত্যুদণ্ডের নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে অনেকগুলি মাদক পাচার বা ধর্মত্যাগের মতো অ-প্রাণঘাতী অপরাধের জন্য। এই ধরনের প্রথা UDHR-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে, যা “নিষ্ঠূর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি” নিষিদ্ধ করে। এই শাস্তিগুলির মানসিক এবং শারীরিক ক্ষতি প্রকাশ্যে প্রয়োগ করা হয় ভয়কে সর্বাধিক করার জন্য, যা মানুষদের কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বস্তুতে পরিণত করে, তাদের সহজাত মূল্যকে হরণ করে।

শরিয়ার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে হুদুদ শাস্তি কঠোর প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার কারণে খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। তবে, এই দাবি মিথ্যা। পাকিস্তানে, হুদুদ অধ্যাদেশ (১৯৭৯–২০১৬) দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে হাজার হাজার নারীকে ব্যভিচারের অভিযোগে কারাগারে পাঠিয়েছে যা প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহৃত হয় (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২০১৬)। এই ধরনের আইনের অস্তিত্বই ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভিন্নমত দমন করে এবং শাস্তির ভয় দেখিয়ে সম্মতি আদায় করে। শরিয়ার শাস্তি ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ইসলামিক আইনের ছদ্মবেশে আমানবিকতা প্রতিষ্ঠিত করে।

লিঙ্গ বৈষম্য: নারীদের স্বাধীনতা হরণ

শরিয়ায় নারীদের প্রতি আচরণ অমানবিকতার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। কুরআন ৪:৩৪-এর মতো গ্রন্থের পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে, যেখানে অবাধ্য স্ত্রীদের “আঘাত করার” অনুমতি দেওয়া হয়েছে, শরিয়া লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসকে ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে বৈধতা দেয়। পারিবারিক আইনে, নারীরা নিয়মিতভাবে বৈষম্যের শিকার: একজন মেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে ছেলের অর্ধেক অংশ পায় (কুরআন ৪:১১), একজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক হিসেবে বিবেচিত হয় (কুরআন ২:২৮২), এবং পুরুষদের জন্য বহুবিবাহ অনুমোদিত হলেও নারীদের জন্য না (কুরআন ৪:৩)।

ইরানে, যেখানে আইনি ব্যবস্থার ভিত্তি শরিয়া, সেখানে নারীরা বাধ্যতামূলক ভাবে হিজাব আইনের মুখোমুখি হয় এবং পুলিশ দ্বারা বলবৎ করা হয়। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির “অনুপযুক্ত” হিজাব পরার অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা (সম্ভবত হত্যা করা হয়েছে) সারা দেশে বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়, যা দেখিয়েছে যে শরিয়ার মানদণ্ড রক্ষা করতে সরকার নারীদের উপর দমন-পীড়ন চালাতে প্রস্তুত (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ২০২৩)। এই ধরনের আইন নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে, যেখানে তাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ পুরুষ কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রচালিত শালীনতার জন্য বলি দিতে হয়।

এই তো ১৮ মে ২০২২ সালে, অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে এক নারী ও তার দুই বন্ধুর উপর হামলা চালায়, শুধুমাত্র ওই নারীর পরিধানের পোশাককে "অশালীন" বলে আখ্যা দিয়ে। হামলাকারীদের ওপর কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

শরিয়ার পক্ষসমর্থকরা দাবি করেন যে এটি নারীদের “সুরক্ষা” দেয় তাদের পরিপূরক ভূমিকা নির্ধারণের মাধ্যমে, এই যুক্তি পুরোপুরি অর্থহীন। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে (২০২১–বর্তমান), শরিয়াভিত্তিক আদেশে নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষা ও অধিকাংশ কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা কার্যত তাদের জনজীবন থেকে মুছে ফেলেছে (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২০২৪)। নির্বাচিত হাদিসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া এই নীতিমালাগুলো মানবাধিকার সনদের ১ এবং ২ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে, যেখানে সবার সমান মর্যাদা ও অধিকার স্বীকৃত। শরিয়ার লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো রক্ষাকবচ নয়, বরং একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা, যেখানে নারীরা চিরকাল অধীনতায় আবদ্ধ থাকে।

ব্যক্তি স্বাধীনতার দমন: ধর্মীয় অনুশাসনের একনায়কতন্ত্র

শরিয়ার ব্যক্তি-স্বাধীনতার উপর নিষেধাজ্ঞা এর মানবতাবিরোধী স্বভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ইসলাম ত্যাগ, যাকে ধর্মত্যাগ বলা হয়, তা শরিয়াভিত্তিক বহু আইনি ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, যেমন সৌদি আরব, ইরান এবং মরিতানিয়ায় (পিউ রিসার্চ সেন্টার, ২০১৩)। সহিহ বুখারী ৯.৮৪.৫৭-এর মতো হাদিসের উপর ভিত্তি করে এই দণ্ড আরোপ করা হয়, যা মানবাধিকার সনদের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আরেকটি শরিয়া ভিত্তিক দমনমূলক ব্যবস্থা হলো ধর্মনিন্দা আইন। পাকিস্তানে দণ্ডবিধির ২৯৫-সি ধারায়  নবী মুহাম্মদকে অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৯৮৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১,৫০০-রও বেশি মানুষ ধর্মনিন্দার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, যার অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যা অভিযোগ ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে (ইউএসসিআইআরএফ, ২০২২)। এই আইনগুলো এমন এক ভীতির পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মতভেদ বা ধর্মীয় বিষয়ে সাথারণ একটি প্রশ্নও জনরোষ বা রাষ্ট্র অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শরিয়ার সমর্থকেরা বলেন যে এই ধরনের বিধিনিষেধ সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐশী শৃঙ্খলা রক্ষা করে। কিন্তু এই যুক্তি আদর্শিক একরূপতাকে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর প্রাধান্য দেয়, যা স্বৈরাচারী শাসনের বৈশিষ্ট্য। ২০১৪ সালে সৌদি আরবে ব্লগার রাইফ বাদাওয়িকে “ইসলাম অবমাননার” অভিযোগে ১,০০০ বেত্রাঘাত এবং ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল, যা শরিয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি অসহিষ্ণুতার উদাহরণ (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ২০১৫)। ভিন্নমতকে স্তব্ধ করা এবং মুক্তচিন্তাকে শাস্তি দিয়ে শরিয়া মানবজাতির সম্ভাবনার মূল গুণাবলি—যুক্তি, সৃজনশীলতা, ও ব্যক্তিসত্তা—কে দমিয়ে রাখে।

বাংলাদেশে শরিয়া আইনের কিছু মব জাস্টিস আমরা আগেই দেখেছি, ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে। এরপর ব্লগার ও আন্দোলনকারীদের উপর ধারাবাহিক হামলা চালায় উগ্র ইসলামপন্থীরা। ২০১৩-২০১৫ সালের মধ্যে অভিজিৎ রায়, রাজীব হায়দার, অনন্ত বিজয় দাসসহ অনেক ব্লগার ও লেখক খুন হন। এসব হামলার দায় স্বীকার করে আল-কায়েদা ও আইএস।

২০১৬-২০১৭ সালে সংখ্যালঘু, এলজিবিটি কর্মী ও বিদেশিদের উপর হামলা বাড়ে। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলায় ১৭ বিদেশিসহ ২৮ জন নিহত হন। এইসব সন্ত্রাসী হামলায় ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। ধর্মীয় উগ্রবাদ সমাজে সহিংসতা ও অস্থিরতার বড় উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

শরিয়ার বিশ্বব্যাপী প্রভাব: সর্বজনীন মানদণ্ডের জন্য হুমকি

রাষ্ট্রীয় নীতিমালা এবং অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর মাধ্যমে শরিয়ার প্রচলন অমানবিকতার প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস) এবং বোকো হারামের মতো সংগঠনগুলো দাসত্ব, ধর্ষণ ও গণহত্যার মতো ব্যাপক নৃশংসতার ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য শরিয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও এই গোষ্ঠীগুলিকে প্রায়শই “চরমপন্থী” হিসেবে লেবেল দেওয়া হয়, তাদের আইনি কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্লাসিকাল শরিয়া গ্রন্থ থেকে গৃহীত, যেমন ইবন তাইমিয়ার জিহাদ ও শাস্তি সম্পর্কিত লেখাসমূহ (কেপেল, ২০১৭)। এটি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে: যদি শরিয়াকে এত সহজে অমানবিক কার্যক্রমে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে সমস্যা কোথায়? ইসলামী শরিয়ার ব্যাখ্যায়, নাকি এর মূলনীতিতেই?

এমনকি “মধ্যপন্থী” প্রেক্ষাপটেও, শরিয়ার প্রভাব মানবাধিকারের ভিত্তিকে দুর্বল করে। মালয়েশিয়ায়, শরিয়া আদালত সমলিঙ্গ সম্পর্ক ও “ক্রস-ড্রেসিং” অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং এসবের জন্য বেত্রাঘাতসহ নানা শাস্তি দেয় (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ২০২৩)। এই ব্যবস্থা শরিয়ার নৈতিক পরমতাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যা আন্তর্জাতিক আইনে নিশ্চিত করা সমতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নীতিমালার পরিপন্থী। রাষ্ট্রীয় আইন বা সাংস্কৃতিক নিয়ম যেভাবেই হোক, শরিয়ার বৈশ্বিক প্রসার মানব মর্যাদা রক্ষার সর্বজনীন মানদণ্ডকে ক্ষয় করে।

শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ বিদেশী বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আধুনিক অর্থনীতি স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের উপর নির্ভর করে। শরিয়া আইনের প্রয়োগে যদি ধর্মীয় পক্ষপাত বা অস্পষ্টতা থাকে, তবে এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শরিয়া-ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা দেশের আর্থিক খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

বাংলাদেশ একটি বহুসংস্কৃতির সমাজ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। শরিয়া আইনের প্রয়োগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ ও ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে, যা সামাজিক বিভেদকে উস্কে দেবে। এটি দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইসলামিক শরিয়া আইনের প্রয়োগ বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি বৈচিত্র্যময় ও গণতান্ত্রিক দেশে, আইন ব্যবস্থা সকল নাগরিকের জন্য নিরপেক্ষ, ন্যায়সঙ্গত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত। শরিয়া আইনের পরিবর্তে, একটি সুষ্ঠু ও আধুনিক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার উপর, যেখানে সকলের অধিকার ও মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত।

ইসলামিক শরিয়া আইনের শাস্তিমূলক নিষ্ঠুরতা, লিঙ্গ নিপীড়ন এবং ব্যাক্তি-স্বাধীনতার দমন মানবতার প্রতি একটি গভীর অবমাননা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এর সমর্থকেরা এটি ঈশ্বরপ্রদত্ত বৈধতার আবরণে ঢেকে রাখার চেষ্টা করলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন, যা একটি ভয়াবহ ব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে নিয়ন্ত্রণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। সর্বজনীন মানবাধিকারের সঙ্গে শরিয়ার অসামঞ্জস্যতা কোনো ভুল ব্যাখ্যার ফল নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ত্রুটি, যা এর কঠোর, পশ্চাৎপদ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি থেকে জন্ম। মানবজাতির বিকাশের জন্য, এমন সব কাঠামো প্রত্যাখ্যান করতে হবে যা ঐশ্বরিকতার নামে মানবতাকে অস্বীকার করে, এবং এমন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হবে যা প্রতিটি মানুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করে।

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন