নবী মুহাম্মদ চাঁদ দুই ভাগ করেনি, চাঁদে আযান শোনা যায়নি, নীল আর্মস্ট্রং ইসলাম গ্রহণ করেনি

ইসলামের কিছু অনুসারীদের মধ্যে একটি প্রচলিত দাবি হলো যে নবী মুহাম্মদ অলৌকিকভাবে চাঁদ দুই টুকরো করে দেখিয়েছিলেন, যা নাকি তৎকালীন মক্কার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি হাস্যকর ও মিথ্যা গল্প: অ্যাপোলো ১১ মিশনে নীল আর্মস্ট্রং নাকি চাঁদে ফাটল দেখেছেন, আজানের শব্দ শুনেছেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এই দাবিগুলো শুধুমাত্র বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব নয়, বরং এতটাই লজ্জাজনক ও বেহায়াপনার পরিচায়ক যে এগুলো প্রচার করা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিকতার প্রতি সরাসরি অপমান। এই নিবন্ধে আমরা এই দাবিগুলোর অসারতা বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং যুক্তির আলোকে খণ্ডন করব, এবং দেখাব কেন এই মিথ্যাগুলো ছড়ানো মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু অংশের অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার প্রকাশ।

চাঁদ দিখণ্ডিতের দাবি: বিজ্ঞানের কাছে একটি অচল কল্পকাহিনী

ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থে, বিশেষ করে কোরানের সূরা আল-কামার (৫৪:১-২)-এ বলা হয়েছে, “ঘটনা ঘনিয়ে এসেছে এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে” । এই আয়াতের ভিত্তিতে কিছু মুসলিম পণ্ডিত ও অনুসারী দাবি করেন যে নবী মুহাম্মদ একবার আঙুলের ইশারায় চাঁদ দুই টুকরো করে দেখিয়েছিলেন, যা মক্কার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল। কিছু হাদিসে, যেমন সহিহ বুখারি (৪৮৬৪), এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বলা হয় যে মক্কার কাফেররা নবীর কাছে অলৌকিক চিহ্ন চেয়েছিল, এবং তিনি চাঁদ ভেঙে তাদের দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এই দাবির কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ঐতিহাসিক রেকর্ডে এমন কোনো ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই। সপ্তম শতাব্দীতে চীন, ভারত, মেসোপটেমিয়া এবং ইউরোপের সভ্যতাগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ করত। চীনের তাং রাজবংশের নথি এবং ভারতের গুপ্ত যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্রের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, কিন্তু চাঁদ ভাঙার মতো কোনো অসাধারণ ঘটনার উল্লেখ নেই (Pingree, 1978)। এমনকি আরব উপদ্বীপের সমসাময়িক অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো নথিতেও এই ঘটনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই অভাব স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি ধর্মীয় গল্পকথা, যা পরবর্তী সময়ে রচিত হয়েছে এবং বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অচল।

চাঁদ একটি বিশাল শিলা ও ধাতব পদার্থের গোলক, যার ভর ৭.৩৪২×১০^২২ কিলোগ্রাম এবং ব্যাস ৩,৪৭৪ কিলোমিটার (NASA, 2020)। এটিকে দুই টুকরো করতে হলে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা পৃথিবীর সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্রের মোট শক্তির চেয়েও বহুগুণ বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এমন একটি ঘটনা ঘটলে চাঁদের কক্ষপথে বিশাল পরিবর্তন হতো, পৃথিবীর জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেত, এবং সৌরজগতের গ্রহগুলোর মাধ্যাকর্ষণ ভারসাম্য বিঘ্নিত হতো (Melosh, 1989)। এই ধরনের একটি ঘটনা পৃথিবীর জলবায়ু, ভূত্বক এবং জীববৈচিত্র্যের উপরও বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলত।

এই দাবি প্রচার করা মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু অংশের অজ্ঞতা ও বেহায়াপনার প্রমাণ। তারা বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিগুলোকে অগ্রাহ্য করে অন্ধ বিশ্বাসের পেছনে ছোটে, যা তাদের ধর্মের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ধরনের দাবি শুধুমাত্র অবৈজ্ঞানিক নয়, বরং নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্যও লজ্জার কারণ।

নীল আর্মস্ট্রং ও আজানের বানোয়াট গল্প

১৯৮০-এর দশকে মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকায়, একটি গল্প ছড়িয়ে পড়ে যে ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে ফাটল দেখেছেন, আজানের শব্দ শুনেছেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এই গল্পটি কিছু মুসলিম প্রচারক এবং ধর্মীয় নেতারা উৎসাহের সঙ্গে ছড়িয়েছেন, দাবি করে যে এটি ইসলামের সত্যতার প্রমাণ। কিন্তু এই গল্পটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং বিজ্ঞানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ: চাঁদে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, যা শব্দ তরঙ্গ বহনের জন্য প্রয়োজন। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি অনুসারে, শূন্যস্থানে শব্দ প্রচারিত হতে পারে না (Feynman, 1963)। তাই চাঁদে আজানের শব্দ শোনা শুধু অসম্ভব নয়, এটি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মকে উপহাস করার শামিল। অ্যাপোলো ১১ মিশনের অডিও রেকর্ডিং, যা নাসার আর্কাইভে সংরক্ষিত, তাতে কোনো আজান বা অস্বাভাবিক শব্দের উল্লেখ নেই (NASA, 1969)।

এছাড়া, চাঁদের পৃষ্ঠে যেসব ফাটল বা রিল (rilles) দেখা যায়, সেগুলো ভূতাত্ত্বিক কারণে সৃষ্ট, যেমন লাভা প্রবাহ, ভূমিকম্প বা উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট ক্র্যাটার। এই ফাটলগুলো বিলিয়ন বছর পুরোনো এবং অ্যাপোলো মিশনের ছবি ও লুনার রিকনেসান্স অরবিটারের ডেটায় এগুলোর ভূতাত্ত্বিক উৎপত্তি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে (Watters et al., 2010)। এই ফাটলগুলোর সঙ্গে কোনো “চাঁদ ভাঙার” ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

নীল আর্মস্ট্রংয়ের ধর্মান্তরণের গুজব

নীল আর্মস্ট্রংয়ের ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো ১১ মিশনে চাঁদে আজান শোনার এবং পরে ইসলাম গ্রহণের মিথ্যা গুজব ১৯৮০-এর দশকে মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিশর এবং পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। এই গুজবের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় একটি গান, "গেমা সুয়ারা আদজান দি বুলান" ("চাঁদে আজানের প্রতিধ্বনি"), রচিত হয়, যা এই মিথ্যা দাবিকে উদযাপন করার জন্য তৈরি হয়েছিল। গানটি ইন্দোনেশিয়ার কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাব ফেলে, এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকে আরও জনপ্রিয় করে যে চাঁদে আজান শোনা গিয়েছিল।

গুজবটি প্রথম ছড়ায় ধর্মীয় প্রকাশনা, খুতবা এবং মৌখিকভাবে। একটি জনপ্রিয় গল্প ছিল যে আর্মস্ট্রং ১৯৮৩ সালে মিশরে একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গিয়ে আজান শুনে চিনতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ কেউ দাবি করেন যে তিনি চাঁদে কাবার দিকে নির্দেশকারী “তরঙ্গ” দেখেছিলেন বা নাসা এই তথ্য গোপন করেছে। এই গল্পগুলো ধর্মীয় সমাবেশ, পুস্তিকা এবং পরে ইন্টারনেট ফোরামের মাধ্যমে ছড়ায়, বিশেষ করে ইসলামের “বৈজ্ঞানিক সত্যতা” প্রমাণের উৎসাহে।

নাসা ১৯৮৩ সালে এই দাবিকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে খণ্ডন করে (NASA, 1983)। আর্মস্ট্রং নিজে ১৯৮৩ সালে একটি চিঠিতে এবং ২০০৫ সালে মালয়েশিয়ায় এক সাক্ষাৎকারে এই গল্প অস্বীকার করেন, জানান যে তিনি খ্রিস্টান ছিলেন এবং চাঁদে কোনো আজান শোনেননি (Armstrong, 1983; The Star Malaysia, 2005)। তার জীবনী, First Man: The Life of Neil A. Armstrong (Hansen, 2005), তেও তার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জীবনের বিশদ বিবরণে এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই।

এই দাবির পেছনে বেহায়াপনা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

এই ধরনের মিথ্যা গল্প ছড়ানোর পেছনে মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু অংশের একটি অদ্ভুত মানসিকতা কাজ করে। তারা মনে করে যে ধর্মীয় বিশ্বাসকে জনপ্রিয় করতে মিথ্যা, অতিরঞ্জন বা বানোয়াট গল্পের আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। এটি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের প্রতি অশ্রদ্ধা নয়, বরং নিজেদের ধর্মের প্রতিও অপমান। এই ধরনের গল্প প্রচার করে তারা বিশ্বের কাছে নিজেদের হাস্যকর করে তোলে এবং তাদের বিশ্বাসের দুর্বলতা প্রকাশ করে।

নাসার মতো একটি বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সংস্থা এবং নীল আর্মস্ট্রংয়ের মতো একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে এই মিথ্যার সঙ্গে জড়ানো একটি নীচ মানসিকতার পরিচয়। এই দাবিগুলো প্রচার করা শুধুমাত্র অজ্ঞতা নয়, বরং নৈতিকতা ও সততার সম্পূর্ণ অভাবের প্রমাণ। এটি লজ্জাজনক যে, ২১শ শতাব্দীতে, যখন বিজ্ঞান ও তথ্য এত সহজলভ্য, তখনো কিছু মানুষ এই ধরনের অন্ধ বিশ্বাসে আটকে আছে। এই গল্পগুলো ছড়ানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বিপন্ন করে এবং বিশ্ব দরবারে হাসির পাত্র হয়।

সাংস্কৃতিকভাবে, এই ধরনের গল্প প্রচারের পেছনে কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি সন্দেহ এবং ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের একটি মানসিকতা কাজ করে। তারা বিশ্বাস করে যে তাদের ধর্মকে “প্রমাণ” করতে বিজ্ঞানের বিকৃতি বা মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া গ্রহণযোগ্য। এটি শুধুমাত্র তাদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে না, বরং বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একটি অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।


তথ্যসূত্র:

  • কোরান, সূরা আল-কামার (৫৪:১-২)।
  • সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৮৬৪।
  • NASA (2020). Lunar Reconnaissance Orbiter: Moon Facts.
  • Melosh, H. J. (1989). Impact Cratering: A Geologic Process. Oxford University Press.
  • Pingree, D. (1978). History of Astronomy in India. Brill.
  • Feynman, R. P. (1963). The Feynman Lectures on Physics. Addison-Wesley.
  • Watters, T. R., et al. (2010). Evidence of Recent Thrust Faulting on the Moon. Science, 329(5994), 936-940.
  • NASA (1969). Apollo 11 Mission Archives.
  • NASA (1983). Official Statement on Neil Armstrong Conversion Rumors.
  • Armstrong, N. (1983). Personal Letter Denying Conversion Claims.
  • Hansen, J. R. (2005). First Man: The Life of Neil A. Armstrong. Simon & Schuster.

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন