ইসলামে ফেরাউন সম্পর্কে মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি

ফিরাউনের বিষয়টি ইসলামিক নানা অসত্য দাবির মধ্যে অন্যতম একটি। ইসলামে বহু সময় ধরে মিথ্যা মোজেজা বানিয়ে মানুষকে ধর্মে আকৃষ্ট করার প্রয়াস চালানো হয়ে আসছে—এটা মোটেও নতুন কিছু নয়। তবে বিষয়টি দীর্ঘ না করে চলুন দেখি, ফিরাউন নিয়ে মুসলিমরা কী কী অসত্য প্রচার করে থাকেন।

ফিরাউন (Pharaoh) কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়। প্রাচীন মিশরের রাজাদের একটি উপাধি ছিল "ফারাও", যেটাকে আরবরা বলত "ফিরাউন"। ইতিহাসে মিশরে মোট ৩৩২ জন রাজা শাসন করেছেন এবং প্রত্যেককেই ফারাও/ফেরাউন নামে ডাকা হতো। কোরআনে কোনো নির্দিষ্ট ফিরাউনের নাম উল্লেখ করা হয়নি, বরং শুধুই “ফেরাউন” বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আপনি শুধু "রাজা" বা "প্রধানমন্ত্রী" বললে কার কথা বুঝবেন?

মুসলিমরা যে ফেরাউনের লাশকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করার দাবি করে এবং যাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে বলে বলে, সেই ফেরাউন আসলে দ্বিতীয় রামেসিস (Ramesses II)।

মুসলিমদের দাবি অনুসারে, ফিরাউনের দেহ লোহিত সাগরের তলদেশ থেকে পাওয়া গেছে। অথচ এই দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। সমুদ্র বা নদীর নিচ থেকে কখনো কোনো মমি উদ্ধার হয়নি। দ্বিতীয় রামেসিসের মমি আবিষ্কৃত হয়েছিল DB320 নামের এক সমাধি থেকে। ঐ একই জায়গা থেকে আরও ৫০টি মমিও উদ্ধার করা হয়েছিল। যদিও শুরুতে রামেসিসকে kv7 নামের এক সমাধিতে রাখা হয়েছিল, পরে তাঁকে স্থানান্তর করে Pinudjem II-এর পাশে DB320-তে রাখা হয়।

ইসলামিক বর্ণনা অনুসারে, ফেরাউন নবী মুসাকে তাড়া করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় রামেসিসের মৃত্যুর কারণ ছিল আর্থ্রাইটিস—এটি বার্ধক্যে বহু মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। অর্থাৎ পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, দ্বিতীয় রামেসিস পানিতে ডুবে মরেননি। সুতরাং কোরআনের বর্ণনা সত্য নয়।

এই লাশ সংরক্ষণের পিছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী? প্রাচীন মিশরীয়রা ঠিক কী পদ্ধতিতে মৃতদেহ মমি করত? আসলে তারা ছিল দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত। প্রথমে তারা মাথার খুলি ফুটো করে অথবা নাকের ছিদ্র দিয়ে রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্ক তরল করত এবং সেই তরল নাক দিয়ে বের করে আনত। এরপর খালি খুলি ভর্তি করা হতো রেজিন ও সুগন্ধি দিয়ে। একইভাবে পেট কেটে নাড়িভুড়ি বের করে সেগুলোর জায়গাতেও রেজিন ও সুগন্ধি ঢোকানো হতো। তারপর লাশটিকে ন্যাট্রণ নামক প্রাকৃতিক লবণের ভেতর প্রায় ৭০ দিন রেখে দেওয়া হতো। এরপর লবণ থেকে তুলে পরিষ্কার করে বিভিন্ন তেল লাগিয়ে পুরো শরীরে রেজিনের প্রলেপ দেওয়া হতো। এরপর সেই লাশকে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী লিনেন কাপড়ে জড়ানো হতো। এরপর মৃতের সামাজিক অবস্থান অনুসারে তার পোষাক, মুখোশ ইত্যাদি পরিয়ে কাঠের বাক্সে করে তাকে সমাধিস্থ করা হতো।

সবশেষে, একটা বিষয় সহজভাবে ভেবে দেখুন—যে লাশ আমরা পেয়েছি, সেটি মমি করা অবস্থায়। প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ যদি ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ করতে চাইতেন, তাহলে কি এত প্রাচীন জটিল পদ্ধতি অনুসরণ করতেন? “হও” বললেই তো হয়ে যাওয়ার কথা। সুতরাং, যখন আমরা দেখি মমি করা হয়েছিল, তখন সহজেই বুঝি এই সংরক্ষণ কার্যক্রম আল্লাহর নয়, বরং সেই সময়কার মিশরীয়দের উদ্যোগেই হয়েছিল।

তাই মুসলিমরা, ইসলামিক মোজেজা ঘিরে ভ্রান্ত প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন। সত্যকে জানার চেষ্টা করুন। অন্ধবিশ্বাসে না ভেসে নিজের বিবেক ও যুক্তিকে কাজে লাগান।

বাইবেলে নবী মুসার মাধ্যমে সমুদ্র বিভক্ত হওয়ার কাহিনী রয়েছে ঠিকই, তবে সেখানে বলা হয়েছে ফেরাউনের সেনারা ডুবে মারা যায়, নিজে ফেরাউন নয়। নবী মুহাম্মদের যুগে প্রাচীন মিশরীয় মমির ব্যাপারে ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের। মমি করে লাশ সংরক্ষণের রীতি মুহাম্মদ নিশ্চয়ই জেনেছেন। তাই কোরআনে সমুদ্র বিভাজনের কাহিনী ও লাশ সংরক্ষণের গল্প জুড়ে দেওয়া মোটেও মোজেজা নয়। কোরান ও বাইবেল রচনার শত শত বছর আগেই যা ঘটেছে, তা উল্লেখ করে কোনো অলৌকিকত্ব প্রমাণ হয় না।

কোরআনে আল্লাহ বলেছিলেন, ফেরাউনের লাশ ভবিষ্যতের জন্য একটি নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। অথচ বাস্তবে আমরা দেখি, শুধু মিশরেই অসংখ্য অক্ষত মমি আবিষ্কৃত হয়েছে। শুধু মিশর নয়—আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার ২০-২৫টি দেশেও মমি পাওয়া গেছে। তাহলে সেগুলোর পেছনে কোন মোজেজা কাজ করেছে? কে সেগুলো সংরক্ষণ করেছেন নিদর্শন হিসেবে? কোরআনের মতে, শুধু একটি মমি থাকার কথা। তাই নয় কি?

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন