বাংলাদেশের মাদ্রাসা জঙ্গি তৈরির কারখানা
বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে "জঙ্গি তৈরির কারখানা" বলে যে দাবি উঠেছে, তা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের সমন্বয়ে উদ্ভূত। এটি মূলত এই আশঙ্কা থেকে উঠে এসেছে যে, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি গোষ্ঠীর জন্য নিয়োগ বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। নিচে এই দাবির কারণ এবং পূর্ববর্তী ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করা হলো।
দাবিটি কেন উঠেছে এই দাবি উদ্ভূত হয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে:
ঐতিহাসিক জঙ্গি কার্যক্রম: ১৯৯০-এর দশক থেকে, বাংলাদেশে হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী (হুজি) এবং জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর মতো গোষ্ঠীর স্পরাদিক আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে। কিছু প্রাথমিক জঙ্গি মাদ্রাসায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, যা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৬ সালে মুসলিম মিল্লাত বাহিনী (এমএমবি) কিশোরগঞ্জে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ছদ্মবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং ১৯৮৯ সালে পুলিশি অভিযানে ধরা পড়ে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা: ২০০৫ সালে জেএমবি-র নেতৃত্বে সারাদেশে ৫০০টি বোমা হামলা এবং ২০১৬ সালে ঢাকার হলি আর্টিসান বেকারি হামলা, যাতে ২০ জন নিহত হয়, জঙ্গিবাদের ভয় বাড়িয়ে দেয়। হলি আর্টিসান হামলাকারীদের মধ্যে অভিজাত শহুরে তরুণরা থাকলেও, কিছু গ্রামীণ মাদ্রাসার ছাত্রও জঙ্গি নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল, যা এই ধারণাকে উসকে দেয়।
মাদ্রাসায় নির্দিষ্ট অভিযান: ২০০৯ সালে ভোলার গ্রিন ক্রিসেন্ট মাদ্রাসায় অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং জেএমবি-র সাথে যুক্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উদঘাটিত হয়। এই ধরনের ঘটনা মাদ্রাসাগুলোর প্রতি সন্দেহ বাড়ায়।
বৈশ্বিক ইসলামোফোবিয়া: ৯/১১-এর পর, মাদ্রাসাগুলোকে সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করার বৈশ্বিক ধারণা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও প্রভাব ফেলে। পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং কিছু ভারতীয় আউটলেট বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে জিহাদিদের জন্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিত্রিত করে।
নিয়ন্ত্রণের অভাব: বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এবং কম নিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসাগুলো বিশেষভাবে তাদের অস্বচ্ছ কার্যক্রম এবং রক্ষণশীল পাঠ্যক্রম সন্দেহ জাগায়, বিশেষ করে যখন এগুলো হেফাজতে ইসলামের মতো গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত, যারা জঙ্গি সংগঠনের সাথে সম্পর্কিত।
১৯৮৬: মুসলিম মিল্লাত বাহিনী কিশোরগঞ্জে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে ৩০০ ছাত্র ভর্তি হয় এবং এটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৯ সালে পুলিশি অভিযানে তিন দিনের বন্দুকযুদ্ধে ২১ জন নিহত হয়, যার মধ্যে দুই পুলিশ ছিল, এবং গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হয়।
১৯৯০-এর দশক–২০০০-এর প্রথম দিক: আফগান জিহাদের প্রাক্তন যোদ্ধারা বাংলাদেশে হুজি গঠন করে, মাদ্রাসা থেকে নিয়োগ করে এবং নেটওয়ার্ক স্থাপন করে। কিছু মাদ্রাসা জঙ্গি কার্যক্রমের ছদ্মবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২০০৫: জেএমবি সারাদেশে ৫০০টি একযোগে বোমা হামলা চালায়, যাতে দুজন নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়। গোষ্ঠীর নেতৃত্বে মাদ্রাসায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা ছিল, যা ধর্মীয় বিদ্যালয়গুলোর প্রতি তদন্ত বাড়ায়।
২০০৯: ভোলার গ্রিন ক্রিসেন্ট মাদ্রাসায় অভিযানে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং প্রশিক্ষণ সামগ্রী পাওয়া যায়, চারজন গ্রেপ্তার হয়। এই মাদ্রাসার বিদেশি অর্থায়ন বিদেশ-সমর্থিত জঙ্গিবাদের উদ্বেগ বাড়ায়।
২০১৩–২০১৫: আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (পরে আনসার আল-ইসলাম), আল-কায়েদার একটি শাখা, ব্লগার, শিক্ষাবিদ এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালায় যে হামলাকারীরা মাদ্রাসার ছাত্র ছিল।
২০১৫: র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জেএমবি-র একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অভিযান চালায়, যা গবাদি পশুর খামারের ছদ্মবেশে পরিচালিত হচ্ছিল। এর আগে হাটহাজারীতে ২৫ মাদ্রাসা ছাত্র গ্রেপ্তার হয়।
২০১৬: ঢাকার হলি আর্টিসান বেকারি হামলা, নিও-জেএমবি (আইএসআইএস-সংশ্লিষ্ট জেএমবি শাখা) দাবি করে, মাদ্রাসা ছাত্র এবং অভিজাত শহুরে তরুণদের জড়িত করেছিল। এই হামলার পর ব্যাপক জঙ্গি-বিরোধী অভিযানে ১০০ জনের বেশি জঙ্গি নিহত এবং ২,০০০ গ্রেপ্তার হয়।
২০২২: জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া (জেএএইচএস), আল-কায়েদার একটি শাখা, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের সাথে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তাদের নিয়োগ মাদ্রাসা থেকে হলেও, গোষ্ঠীর নেটওয়ার্কে বিভিন্ন পটভূমির লোক ছিল।
শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুতির পর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জঙ্গিবাদের মোকাবিলার চাপের মুখে রয়েছে। কিছু মাদ্রাসায় হুজি বা আনসার আল-ইসলামের সদস্য লুকিয়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত এইসব মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে চিরুনী অভিযান চালিয়ে সব জঙ্গিদের গ্রেফতার করে শাস্তির ব্যবস্থা করা।
Comments
Post a Comment