ইসলামে সমকামীদের প্রতি বর্বরতা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

সমকামিতা, যা একই লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতি রোমান্টিক বা যৌন আকর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত, এটি কোনো অপরাধ নয়, এই কেবল একটি জৈবিক চাহিদা যা প্রতিটি স্বাভাবিক মানুষ অনুভব করে। একজন সমকামী জন্মথেকেই তার মানষিক ও শারীরিক চাহিদা ভিন্ন থাকে, এর জন্যতো আপনি তাঁকে দোষারোপ করতে পারেন না, কারণ এটি তার জৈবিক চাহিদা যা একদমই স্বাভাবিক। আধুনিক বিজ্ঞান সমকামিতাকে মানব যৌনতার একটি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করে, যা জিনগত, হরমোনাল, এবং স্নায়বিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত।

অপরদিকে ইসলামের ভ্রান্ত, হিংস্র ও পৈশাচিক কুরআন ও হাদিস ভিত্তিক শিক্ষাগুলি সাধারণত সমকামী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে এবং এর জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে, যা বেত্রাঘাত থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রমান করে ইসলাম কোনো আল্লাহ প্রদত্ত বাণী নয় বরং কিছু বর্বর মানুষের দ্বারা লিখিত, মুহাম্মদ তার মধ্যে অন্যতম। কুরআনে নবী লুত -এর কাহিনী উল্লেখ করে, যার জাতি সমকামী আচরণের কারণে ধ্বংস হয়।

সুরা হুদ, আয়াত ৮২ তে লুতের সম্প্রদায়কে ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, এরপর যখন আমার সিদ্ধান্ত কার্যকর হল, তখন আমি জনপদের উপরিভাগ নিচে এবং নিম্নভাগ উপরে উঠালাম এবং তার উপর স্তরে স্তরে কাঁকর-পাথর বর্ষণ করলাম। সূরা শুআরা, আয়াত ১৬৫-১৭৫ তেও তাদের উপর কঠিন পাথরের আঘাতের উল্লেখ করে।

ইসলাম ও মুহাম্মদের সমকামীদের হত্যার নির্দেশ

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছে , যাদেরকে তোমরা লুতের সম্প্রদায়ের কাজে (সমকামে) লিপ্ত দেখবে তাদের উভয়কেই হত্যা করো। (তিরমিজি: ৪/৫৭; আবু দাউদ: ৪/২৬৯; ইবনে মাজা: ২/৮৫৬)।

সুনান আবু দাউদ ৪৪৪৭ এ বলা হয়েছে, যদি তুমি কাউকে লূতের সম্প্রদায়ের কাজ করতে দেখো, তবে কর্তা ও ভুক্তভোগী উভয়কে হত্যা করো।

আল্লামা বিন বায বলেন, "সমকামিতার শাস্তি হল, হত্যা। এ ব্যাপারে মুহাম্মদ ও তার সাহাবিদের সম্মিলিত অভিমত রয়েছে। তারা সকলেই একমত যে, সমকামীকে হত্যা করা হবে চাই যে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক।

কতিপয় ফকিহ বলেন যে, সমকামিতার ক্ষেত্রে জিনার মতই বিবাহিত হলে, তার শাস্তি পাথর মেরে হত্যা আর অবিবাহিত হলে এক একশ চাবুক ও একবছর দেশান্তর।

ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৬১০, আবু বকর, ‘আলী, ‘আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এবং হিশাম ইবন আব্দুল মালিক রহ. সমকামীদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সমকামীকে মহল্লার সর্বোচ্চ প্রাসাদের ছাদ থেকে উপুড় করে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তার উপর পাথর মারা হবে (ইবন আবী শাইবাহ, হাদীসং ২৮৩২৮; বায়হাক্বী: ৮/২৩২)।

ইসলাম কতটা বর্বর আর নৃশংস যে একজন মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির জন্য তাকে হত্যা করতে নির্দেশ দেয়। আসুন দেখি বিজ্ঞান কি বলে। 

সমকামিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ:  (লেখার শেষে অথবা প্রথম কমেন্ট এ রেফারেন্স)

অ্যামেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন (APA), অ্যামেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য হলো—সমকামিতা মানব যৌনতার একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য, মানসিক ব্যাধি নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বহু শাখার বিস্তৃত গবেষণার উপর ভিত্তি করে।

বিবর্তনমূলক প্রেক্ষাপট, প্রাণীদের মধ্যে সমকামিতা

প্রাণীদের মধ্যে উভকামীতা/সমকামিতা বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিতভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ এবং কীটপতঙ্গের মধ্যে সমলিঙ্গ ও উভলিঙ্গ আচরণ বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, বেইলি ও জুক (২০১০) তাঁদের Animal Behaviour পর্যালোচনায় ৪৫০টিরও বেশি প্রজাতির মধ্যে সমলিঙ্গ যৌন আচরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে প্রাইমেট, ডলফিন এবং গালের মতো পাখিদের মধ্যে উভকামী মিথস্ক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়ং প্রমুখ (২০০৮) Hormones and Behavior-এ পুরুষ র‍্যামদের মধ্যে উভকামী মাউন্টিংয়ের বিবরণ দিয়েছেন, যা মস্তিষ্কের গঠনের পার্থক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাগেমিল (১৯৯৯) Biological Exuberance বইয়ে বনোবো, পেঙ্গুইন ও জিরাফের মতো প্রাণীর মধ্যে উভলিঙ্গ আচরণের তালিকা করেছেন, যেগুলো প্রায়ই সামাজিক বন্ধন বা প্রজনন কৌশলের নমনীয়তার জন্য দেখা যায়। এসব আচরণ প্রমাণ করে যে এদের মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য বা সংঘাত হ্রাসের মতো বিবর্তনগত সুবিধা থাকতে পারে। 

জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক প্রমাণ

জেনেটিক গবেষণা: যমজ ভাইবোনের উপর গবেষণায় দেখা গেছে যে যৌন অভিমুখিতার একটি বংশগত উপাদান আছে। ২০১৯ সালে Science পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Ganna et al.) ৪ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের জেনোম বিশ্লেষণ করে দেখা যায় কিছু জিনগত পরিবর্তন সমকামী আচরণের সাথে সম্পর্কিত, যা এর জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে নির্দেশ করে। যদিও কোনো "সমকামী জিন" নেই, একাধিক জিনগত উপাদান একত্রে ভূমিকা রাখে—যেমনটি উচ্চতা বা ব্যক্তিত্বের মতো জটিল বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা: স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গবেষণা (যেমন LeVay, 1991) দেখিয়েছে যে সমকামী ও বিষমকামী পুরুষদের হাইপোথ্যালামাসের গঠনে (যেমন INAH-3) পার্থক্য থাকে, যা যৌন অভিমুখিতার সাথে সম্পর্কিত স্নায়ুবৈজ্ঞানিক পার্থক্যকে নির্দেশ করে। এসব পার্থক্য জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই থাকে, অর্থাৎ এগুলো জন্মগত।

হরমোন প্রভাব: গর্ভকালীন টেস্টোস্টেরনের মতো যৌন হরমোনের মাত্রা পরবর্তীতে যৌন অভিমুখিতায় প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, Hines (2011)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় হরমোনের তারতম্য যৌন অভিমুখিতার বিকাশে ভূমিকা রাখে, যা এর জৈবিক ভিত্তিকে সমর্থন করে।

মনোবিজ্ঞান ও মনোরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত মতামত

১৯৭৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (APA) সমকামীতাকে মানসিক ব্যাধির তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়, কারণ এটি নিজে থেকে কোনো মানসিক ক্ষতি বা অক্ষমতা তৈরি করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালে ICD-10 থেকে একে বাদ দেয়।

গবেষণায় (Meyer, 2003) দেখা গেছে যে LGBTQ+ জনগোষ্ঠীর মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতার মূল কারণ সামাজিক বর্জন ও বৈষম্য. সহানুভূতিশীল পরিবেশে সমকামী বা উভকামী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বিষমকামীদের মতোই ভালো হয়। দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় (Savin-Williams & Ream, 2007) দেখা গেছে যৌন অভিমুখিতা কৈশোরে প্রাকৃতিকভাবে গঠিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়ের সাথে তা স্থিতিশীল থাকে।

যারা সমকামীতা বা উভকামীতাকে ব্যাধি বা মানষিক সমস্যা মনে করেন, তারা সাধারণত ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত, বিজ্ঞানের ভিত্তিতে নয়। সমকামী ও উভয়কামীরাও আমাদের মতোই স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশী, আমাদের উচিত ইসলামের নৃশংসতা বর্জন করে সব মানুষকে সমাজে জায়গা করে দেয়া।


বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স:

গান্না, এ., এবং অন্যান্য। (২০১৯)। সমলৈঙ্গিক যৌন আচরণের জিনগত ভিত্তি: একটি জিনোম-ব্যাপী সম্পর্ক অধ্যয়ন। বিজ্ঞান পত্রিকা, ৩৬৫(৬৪৫৬), ৮৬৯-৮৭৪। https://doi.org/10.1126/science.aat7693

লেভে, এস। (১৯৯১)। হাইপোথ্যালামাসে পার্থক্য এবং যৌন প্রবৃত্তি। বিজ্ঞান পত্রিকা, ২৫৩(৫০২৩), ১০৩৪-১০৩৭। https://doi.org/10.1126/science.1887219

হাইন্স, এম। (২০১১)। প্রিনেটাল হরমোন এবং যৌন প্রবৃত্তির বিকাশ। মনো-নিউরোইন্ডোক্রিনোলজি পত্রিকা, ৩৬(৪), ৪৬৬-৪৭৩। https://doi.org/10.1016/j.psyneuen.2010.08.012

বাগেমিহল, বি। (১৯৯৯)। জৈবিক প্রাচুর্য: প্রাণীদের মধ্যে সমলৈঙ্গিকতা এবং যৌন বৈচিত্র্য। সেন্ট মার্টিন'স প্রেস।

মেয়ার, আই. এইচ। (২০০৩)। সংখ্যালঘু চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্য: এলজিবিটিকিউ+ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা। মনোবিজ্ঞান বুলেটিন, ১২৯(৫), ৬৭৪-৬৯৭। https://doi.org/10.1037/0033-2909.129.5.674

স্যাভিন-উইলিয়ামস, আর. সি., এবং রিম, জি. এল। (২০০৭)। যৌন প্রবৃত্তির বিকাশ এবং স্থিতিশীলতা। উন্নয়নমূলক মনোবিজ্ঞান পত্রিকা, ৪৩(১), ১৫-২৫। https://doi.org/10.1037/0012-1649.43.1.15

হার্ডট, জি. (১৯৯৪)। সাম্বিয়া যৌন সংস্কৃতি: পুরুষত্ব এবং যৌনতার উপর গবেষণা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস।

আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন। (২০০৯)। যৌন প্রবৃত্তি পরিবর্তনের চেষ্টা সম্পর্কিত প্রতিবেদন। https://www.apa.org/pi/lgbt/resources/therapeutic-response.pdf

পিউ রিসার্চ সেন্টার। (২০২০)। বৈশ্বিক এলজিবিটি অধিকার এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। https://www.pewresearch.org/global/2020/06/25/global-divide-on-homosexuality-persists/

বেইলি, এন. ডব্লিউ., এবং জুক, এম. (২০১০)। একই-লিঙ্গের যৌন আচরণ এবং বিবর্তন। অ্যানিমাল বিহেভিয়ার, ৮০(৩), ৩৯৫–৪০৪। https://doi.org/10.1016/j.anbehav.2010.05.013

ইয়ং, এল. জে., এবং আলেকজান্ডার, বি. (২০০৮)। সামাজিক বন্ধন এবং সংযুক্তির স্নায়ুবিজ্ঞান: প্রাণীদের মধ্যে একই-লিঙ্গের যৌন আচরণের প্রভাব। হরমোনস অ্যান্ড বিহেভিয়ার, ৫৪(৫), ৬১১–৬১৮। https://doi.org/10.1016/j.yhbeh.2008.06.007

বাগেমিহল, বি. (১৯৯৯)। বায়োলজিকাল এক্সুবারেন্স: অ্যানিমাল হোমোসেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড ন্যাচারাল ডাইভার্সিটি। সেন্ট মার্টিনস প্রেস। ISBN: ৯৭৮-০-৩১২-১৯২৩৯-৬

Comments

Popular posts from this blog

মানুষের কর্মের জন্য আল্লাহ দায়ী

নবী মুহাম্মদের আয়ের উৎস কী ছিল?

শবে মিরাজের চুরি করা গল্প: সেই রাতে মুহাম্মদ ও উম্মে হানির অনৈতিক রাত্রি যাপন